‘এগুলো কওন লাগে, রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ আছে না’

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

সারাদেশ

খামারে গরু-মুরগি পালন করে সংসারের চাকা ঘোরান নুরুল আলম (৪৫)। বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের বরপুরা এলাকায় তার মালিকানাধীন জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি

2026-08-28T09:47:06+00:00
2026-08-28T10:41:46+00:00
 
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
‘এগুলো কওন লাগে, রিপোর্ট দিতে কিছু খরচ আছে না’
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৭ এএম  আপডেট: ২৮.০৮.২০২৬ ১০:৪১ এএম
এসআই সুমন কবির মৃধা। ছবি : সংগৃহীত
খামারে গরু-মুরগি পালন করে সংসারের চাকা ঘোরান নুরুল আলম (৪৫)। বাঁশখালীর চন্দ্রপুর গ্রামের বরপুরা এলাকায় তার মালিকানাধীন জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্ম। ঘাম-শ্রমে গড়ে তোলা সেই খামারেই গত ৭ জুলাই দিবাগত রাতে ঘটে চুরির ঘটনা। আর সেই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উঠেছে ঘুষ দাবির অভিযোগ।

গত ২৩ জুন খামার দেখাশোনার জন্য ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী এলাকার মাহমুদুল করিম ওরফে মাদু (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেন নুরুল আলম। নিয়োগের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় খামারে চুরি হলে সন্দেহের তীর গিয়ে পড়ে ওই কর্মচারীর দিকে।

এ ঘটনায় খামারের মালিক নুরুল আলম বাদী হয়ে গত ২৬ জুলাই বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্তের নির্দেশ দেন।

মামলার আরজিতে বলা হয়, রাতের আঁধারে প্রকল্পে কেউ না থাকার সুযোগে প্রজেক্ট অফিসের ড্রয়ার থেকে নগদ ২৭ হাজার টাকা, প্রায় ৩ হাজার টাকা মূল্যের পাঁচটি দেশি মুরগি এবং ৯০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকে পলাতক মাহমুদুল করিম।

মামলাটির তদন্তভার পান রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমন কবির মৃধা। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। তবে তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। মামলার প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে খামারি নুরুল আলমের কাছে টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে তদন্ত কর্মকর্তা সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে।

নুরুল আলমের ভাষ্য, মামলা করার প্রায় এক সপ্তাহ পর তাকে ফোন করে রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে যেতে বলেন এসআই সুমন কবির মৃধা। তিনি গুণাগরী গিয়ে ফোন করলে তাকে ‘পিউরিয়া’ নামের একটি দোকানে যেতে বলা হয়। সেখানে গিয়ে মামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানান তিনি। নুরুল আলমের দাবি, সেদিন নাশতার বিল বাবদ তাকেই ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। ফেরার সময় গাড়িভাড়ার কথা বলে আরও ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয় তার কাছ থেকে।


গত ২৬ আগস্ট মামলার তদন্ত করতে জামশেদ এক্সপ্রেস ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্মে যান এসআই সুমন কবির মৃধা। সরেজমিনে তদন্ত শেষে মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুনরায় ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন খামারি নুরুল আলম।

তিনি বলেন, প্রথম ধাপে তাকে আমি ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছি। আমি একজন ক্ষুদ্র খামারি। গতকাল তদন্ত করতে এসে আমার কাছ থেকে ওসি স্যারকে দেওয়ার কথা বলে আবার ৫ হাজার টাকা দাবি করতেছে। আমি তখন তাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছি। দাবিকৃত বাকি টাকা না দিলে আমার পক্ষে রিপোর্ট দিবে না বলে সাফ জবাব দিয়েছে।

একজন ক্ষুদ্র খামারির কাছে তদন্ত প্রতিবেদন যেন আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া না হয়ে দাঁড়িয়েছে টাকার অঙ্কে— এমনটাই অভিযোগ নুরুল আলমের।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে এ প্রতিবেদক ফোন করেন এসআই সুমন কবির মৃধাকে। টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকার বিষয়ে এটা কওয়া লাগে নাকি? মামলার রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কিছু খরচ আছে না? এটা কেউ দেয়। আবার কেউ দেয় না। এটা যার যার ব্যাপার। এটা ভুয়া কথা। আমি জোর করে চাইনি।

তদন্ত প্রতিবেদনের বিনিময়ে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে তার এমন বক্তব্য নিয়েই উঠছে নানা প্রশ্ন।

ওসিকে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন কবির মৃধা বলেন, রিপোর্ট দিতে দেরি আছে। রিপোর্ট দেওয়ার সময় আছে আরও ৩ মাস। যে সময় রিপোর্ট দিমু, তখন এটার বিষয়ে কথা কমুনি।

অভিযোগের বিষয়ে বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধাংশু শেখর হালদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এটার বিষয়ে আমি তাকে বলে দিচ্ছি। আপনি বাদীর নাম বলুন।

তবে এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, এটা একটা বদমায়েশ। এ পর্যন্ত ওসি টাকা নিয়েছে এমন কিছু শুনেছেন? আমি তো কখনো এসবকে প্রশ্রয় দেই না। আপনি মামলা নম্বরটা পাঠিয়েন। দ্রুত রিপোর্ট দিয়ে দেবে। আমি তাকে বলে দেব। পারফরম্যান্স খারাপ থাকলে, তারা চাকরিও করতে পারবে না।

ওসির নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ওসির নাম তো সবাই বেচে। বোঝেন নাই? ওসির নাম না বেচলে হয়? ওসির নাম সবাই বেচে। আপনি আমাকে মামলা নম্বরটা দিয়েন। আমি বলে দেব।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে কর্মরত এসআই সুমন কবির মৃধার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এবারই প্রথম নয়। মামলার তদন্ত প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে সেবাপ্রার্থীদের নানা কৌশলে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

একদিকে মামলার বাদীর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে তদন্ত প্রতিবেদনকে ঘিরে অর্থ দাবির অভিযোগ; সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, আইনের কাছে যেখানে সত্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা, সেখানে সেই সত্য কি টাকার অঙ্কে মাপা হচ্ছে?

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই ও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীসহ স্থানীয়রা।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  বাঁশখালী  অ্যাগ্রো ফার্ম  পুলিশ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: