রোমান্টিক ঘরানার নাটক ও সিনেমা নির্মাণ বন্ধের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা। নোটিসকে সৃজনশীলতার পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে সরব হয়েছে তারা, জানাচ্ছেন প্রতিবাদ।
শবনম ফারিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মজার ছলে লিখেছেন, ভাগ্যিস আমার প্রেমের নাটক করার মতো বয়স নাই! আমার কোনো টেনশন নাই! এখন থেকে পরকীয়ার নাটক হবে শুধু! অথবা এক স্বামীর চার স্ত্রী, তারা একসঙ্গে ঘুরে, খায় টিকটক করে এমন গল্প বা চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হাইজ্যাকের গল্প, কিংবা এখন থেকে শুধু ছেলেরাই নাটক করতে পারে। মেয়েরা এসব অ্যাক্টিং বাদ দিয়ে বাজার থেকে সি-ফুড কিনে রান্না করে টেবিলে ঢেলে দেবে!
পরিচালক কৌশিক শংকর দাস লিখেছেন, এককালে রোমান্টিক নাটক নির্মাণ করে সুনাম আর দুর্নাম দুটোই হয়েছিল। সুনাম হয়েছিল কারণ সাধারণ দর্শকরা খুব পছন্দ করেছিলেন নাটকগুলো। আর দুর্নাম হয়েছিল কারণ বোদ্ধা দর্শক আর নির্মাতাদের ধারণা ছিল এই ‘সস্তা’ নাটকগুলো নির্মাণ করা খুব সহজ এবং আমাদের দুই পয়সার পাত্তা দিতেন না তারা। ভালোমন্দ যাই হোক, ভাগ্যিস তখন কেউ আমাদের লিগ্যাল নোটিস পাঠায়নি!
নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী বলেছেন, ক্যারিয়ারের পঁচিশ বছর ধরে দর্শক আমাকে রোমান্টিক নির্মাতা হিসেবেই চেনেন। এত বছরে কোনো দিন এমন নোটিস দেখিনি। এতে খুব অবাক হয়েছি। যিনি নোটিস করেছেন তার জীবন থেকে কি প্রেম-ভালোবাসা চলে গেছে? সবার মতো আমিও এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমি আরও বেশি করে রোমান্টিক ভালোবাসার নাটক বানাতে চাই।
আইনি নোটিসের খবরের ফটোকার্ড শেয়ার করে অভিনেতা রওনক হাসান লিখেছেন, নাটক-সিনেমা চলবে। তবে...। অভিনেত্রী বিজরী বরকতুল্লাহ লিখেছেন, খুব ভালো। এখন শুধু অ্যাকশন হবে। মারামারি কাটাকাটি, রক্তারক্তি এগুলো দেখানো হবে...। অভিনেতা আদনান ফারুক হিল্লোল বলেন, এক পাগলে পপুলার হওয়ার জন্য এই নোটিস পাঠাইছে, আর আমারা সবাই সেই পাগলরে আরও পপুলার বানানোর জন্য এই আলোচনায় ব্যস্ত হইছি।
ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি টেলিভিশন শিল্প সংশ্লিষ্টরা যৌথভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এ নিয়ে ৭টি সংগঠন উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি রোমান্টিক নাটক ও সিনেমা নির্মাণ বন্ধের দাবিতে লিগ্যাল নোটিস জারির বিষয়টি টেলিভিশন ও বিনোদন অঙ্গনের পেশাজীবীদের মাঝে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।
কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় তার প্রতিকার করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল মাধ্যমের নির্দিষ্ট কোনো ধারার নির্মাণ বন্ধের উদ্যোগ টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে বলে প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণকে সামগ্রিকভাবে বন্ধ করার দাবি কোনোভাবেই সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেন সংগঠনগুলোর নেতারা। টেলিভিশন শিল্পের সৃজনশীল স্বাধীনতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের কর্মক্ষেত্র এবং দেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করেছে সংগঠনগুলো।
যৌথ এই প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন- শহীদুজ্জামান সেলিম (সভাপতি, ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ), ফরিদুল হাসান (সাধারণ সম্পাদক, ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ), আজাদ আবুল কালাম (সভাপতি, অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ), রাশেদ মামুন অপু (সাধারণ সম্পাদক, অভিনয়শিল্পী সংঘ বাংলাদেশ), শিহাব শাহীন (সভাপতি, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ), মেজবাহ উদ্দিন সুমন (সাধারণ সম্পাদক, টেলিভিশন নাট্যকার সংঘ), সাহিল রনি (সাধারণ সম্পাদক, ক্যামেরাম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ), সাদেক সিদ্দিকী (সভাপতি, অডিও-ভিজ্যুয়াল টেকনিক্যাল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন), রাজ্জাক রাজ (সাধারণ সম্পাদক, টেলিভিশন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরস অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশ), মাহবুব রহমান মানিক (সভাপতি, বাংলাদেশ মেকআপ আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশন)।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও