নাটোরের গুরুদাসপুরে তিন বছর আগে উপজেলা পরিষদের সুপারিশে জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় স্কুলভবন। সম্প্রতি ব্যবহার উপযোগী ভবনটি ভেঙে মাত্র ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। শুধু ওই বিদ্যালয়ের নতুন ভবনই নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো একটি আধাপাকা ভবনও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ভবন দুটি ভাঙার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হলেও তা অনুসরণ করা হয়নি।
এ ঘটনা তদন্তের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা কেএম রাফিউল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— উপজেলা প্রকৌশলী মিলন মিয়া, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম আক্তার ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব হোসেন। এদিকে ব্যবহার উপযোগী ভবন ভেঙে ফেলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রধান শিক্ষক নতুন ভবনটি ভেঙে বিক্রি করেছেন। এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা কেএম রাফিউল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভবন ভাঙার আগে অনুমোদন না নেওয়ায় ওই প্রধান শিক্ষককে কৈফিয়ত তলব করে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও জানান গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ।
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, বিদ্যালয়ে জায়গার সংকট থাকায় নতুন ভবন নির্মাণের জন্য আগের এক তলা ভবন ও পুরোনো আধাপাকা ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর থেকে চার তলা ভিতবিশিষ্ট এক তলা একাডেমিক ভবনের অনুমোদন পাওয়া যাওয়ার পর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
ভবন ভাঙার আগে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি— এ কথা স্বীকার করে প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন আরও বলেন, নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রে সময়স্বল্পতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে মাইকিং করে দরদাতার মাধ্যমে ভবন দুটির নির্মাণসামগ্রী প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির রেজুলেশন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে রেজুলেশন কিংবা বিক্রির অর্থ বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা দেওয়ার কোনো নথি তিনি দেখাতে পারেননি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভবন ভাঙার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসকে আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। এ ছাড়া নতুন ভবনের অনুমোদন পাওয়ার আগেই পুরোনো ভবন দুটি ভেঙে ফেলা হয়। গত ২৩ আগস্ট নতুন ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ২৬ আগস্ট সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আজিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার বলেন, ২০২৩ সালে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল। ভবনটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। সরেজমিন পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলেও জানান উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গুরুদাসপুর উপজেলা প্রকৌশলী মিলন মিয়া বলেন, নারী শিক্ষা প্রসারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উপজেলা পরিষদের সুপারিশে জাইকার অর্থায়নে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি ভবনটি ভেঙে বিক্রি করার বিষয়টি তারা জানতে পারেন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।
বিদ্যালয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এক তলা দুটি ভবন ও দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্প (ইউজিডিপি) ও জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) প্রায় ২২ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫২ টাকা ব্যয়ে একটি এক তলা ভবন নির্মাণ করে। নির্মাণ শেষে ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভবনটি উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু নির্মাণের তিন বছর পেরোতেই চলতি বছরের জুন-জুলাইয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। একই সময়ে বিদ্যালয়ের পুরোনো একটি আধাপাকা ভবনও ভাঙা হয়।
প্রধান শিক্ষকের দাবি, ভবন দুটির ইট, রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী দরদাতার মাধ্যমে প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। তবে ওই অর্থ বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা দেওয়া হয়েছে কি না, প্রধান শিক্ষক তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
সরেজমিন বিদ্যালয়ে দেখা যায়, জাইকার অর্থায়নে নির্মিত এক তলা ভবনটির কোনো অস্তিত্বই নেই। ভবনের বীমের কিছু অংশ খনন করে সরিয়ে নেওয়ায় সেখানে কিছুটা গর্ত রয়েছে। পুরোনো আধাপাকা ভবনটিরও কোনো চিহ্ন নেই। ভবন দুটির ইট, রড বা অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীও বিদ্যালয় চত্বরে দেখা যায়নি। বর্তমানে বিদ্যালয়ের অন্য ভবনে পাঠদান চলছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, প্রায় দুই মাস ধরে শ্রমিক দিয়ে ভবন দুটি ভাঙার কাজ চলে। ভবন ভাঙার সময় মাইকিং করা হয়েছিল বলেও কেউ কেউ জানান। তবে ভবন ভাঙার আগে সরকারি অনুমোদন বা নিলাম-সংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা অবগত নন। তাদের দাবি, মাত্র তিন বছর আগে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবন এত অল্প সময়ে কেন ভাঙা হলো এবং নির্মাণসামগ্রী বিক্রির অর্থ কোথায় গেল তা তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের বর্তমান এডহক কমিটির সভাপতি রনি আহমেদ বলেন, তিনি দেড় থেকে দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। ভবন ভাঙা ও বিক্রির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশও তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বিষয়টির দায়দায়িত্ব প্রধান শিক্ষকের বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি মোতালেব হোসেন বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের জন্য বিদ্যালয়ের জায়গা মাপজোক নিয়ে সভা হয়েছিল। তবে পুরোনো ভবন ভাঙা, নির্মাণসামগ্রী কত টাকায় বিক্রি হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে এসব বিষয়ে প্রধান শিক্ষকই বলতে পারবেন।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে