ডিফেন্ডার হয়েও ব্যালন ডি’অর জেতা যায়—এই প্রশ্নের সবচেয়ে বড় উত্তর ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার। শুধু একবার নয়, দুবার ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারটি জিতেছিলেন জার্মানির এই কিংবদন্তি। ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে ব্যালন ডি’অর জিতে আজও একমাত্র ডিফেন্ডার হিসেবে দুবার এই পুরস্কার জয়ের কীর্তি ধরে রেখেছেন তিনি।
‘ডের কাইজার’—জার্মান ভাষায় যার অর্থ ‘সম্রাট’। ডাকনামটির সঙ্গে বেকেনবাওয়ারের ব্যক্তিত্বও যেন মিলে গিয়েছিল। মাঠে তিনি শুধু রক্ষণ সামলাতেন না, দলকে নেতৃত্ব দিতেন, আক্রমণের সূচনা করতেন এবং মাঝমাঠ পর্যন্ত উঠে এসে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিতেন। সুইপার পজিশনকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন তিনি।
বেকেনবাওয়ারের বায়ার্ন মিউনিখে আসার গল্পটিও বেশ চমকপ্রদ। শৈশবে টিএসভি ১৮৬০ মিউনিখের যুব দলের বিপক্ষে একটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়। একপর্যায়ে তাকে থাপ্পড় মারা হয়। সেই ঘটনার পর টিএসভি ১৮৬০-এ যোগ না দিয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী বায়ার্ন মিউনিখে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তরুণ বেকেনবাওয়ার।
পরবর্তী ইতিহাসে সেই সিদ্ধান্তের প্রভাব স্পষ্ট। বায়ার্নের হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্বসেরাদের কাতারে। ক্লাবটির হয়ে তিনবার ইউরোপিয়ান কাপ জেতেন তিনি, যা বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগের পূর্বসূরি। জার্মানির হয়েও জিতেছেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ।
বিশ্বকাপের মঞ্চে বেকেনবাওয়ারের লড়াকু মানসিকতার অন্যতম বড় উদাহরণ ১৯৭০ সালের সেমিফাইনাল। ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে কাঁধে গুরুতর চোট পান তিনি। তখন খেলোয়াড় পরিবর্তনের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ায় চোট নিয়েই মাঠে থাকতে হয় তাকে। এক হাত শরীরের সঙ্গে বেঁধে রেখেও ম্যাচের বাকি সময় খেলেছিলেন বেকেনবাওয়ার।
সেই ম্যাচ অবশ্য ৪–৩ গোলে জেতে ইতালি। তবে পরাজয়ের মধ্যেও বেকেনবাওয়ারের লড়াই ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেয়।
চার বছর পর ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে অবশ্য আর হতাশ হতে হয়নি তাকে। অধিনায়ক হিসেবে ফাইনালে ইয়োহান ক্রুইফের নেদারল্যান্ডসকে ২–১ গোলে হারিয়ে ওয়েস্ট জার্মানিকে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতান বেকেনবাওয়ার।
খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পর কোচ হিসেবেও একই শিরোপা জেতেন তিনি। ১৯৯০ সালে কোচের ভূমিকায় ইতালির বিশ্বকাপ ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে ওয়েস্ট জার্মানিকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেন।
ব্যক্তিগত অর্জনেও বেকেনবাওয়ারের অবস্থান অনন্য। ১৯৭২ ও ১৯৭৬ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন তিনি। একজন ডিফেন্ডার হিসেবে দুবার এই পুরস্কার জয়ের রেকর্ড এখনো তার দখলে।
খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা ফুটবলের বিরল কীর্তিগুলোর একটি। বায়ার্ন মিউনিখ ও জার্মান ফুটবলে তার অবদানও তাই কেবল শিরোপার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। সুইপার পজিশনে তার খেলার ধরন পরবর্তী প্রজন্মের ডিফেন্ডারদের জন্য নতুন এক মানদণ্ড তৈরি করেছিল।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে বিবেচিত বেকেনবাওয়ার ২০২৪ সালে ৭৮ বছর বয়সে মারা যান। তবে মাঠে তার নেতৃত্ব, সাফল্য এবং ফুটবলে সুইপার পজিশনের নতুন সংজ্ঞা তাকে আজও কিংবদন্তিদের তালিকায় আলাদা করে রেখেছে।
সময়ের আলো/টিকে