সালটা ২০১৪। সাম্বার দেশ ব্রাজিলে বসেছিল ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-খ্যাত বিশ্বকাপ ফুটবল আসর। সেই আসরে অসংখ্য গল্পের ভিড়ে অন্যতম ছিল কলম্বিয়ার দুর্দান্ত উত্থান। টুর্নামেন্ট ঘিরে দেশটির প্রত্যাশাও ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর আগেই দলের সবচেয়ে বড় তারকা রাদামেল ফ্যালকাও চোটে ছিটকে গেলে কলম্বিয়ার সেই স্বপ্নে নেমে আসে শঙ্কার ছায়া। ফ্যালকাওয়ের অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ এক অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের কাঁধে। নাম হামেস দাবিদ রদ্রিগেজ রুবিও, যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হামেস রদ্রিগেজ নামে।
কলম্বিয়ার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে সেই বিশ্বকাপে যে সৃজনশীলতা আর জাদুর ছোঁয়া দেখিয়েছিলেন হামেস, তা ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজও অমলিন। গ্রুপ পর্বে গ্রিস, আইভরিকোস্ট ও জাপানের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই গোল করে আগমনি বার্তা দিয়েছিলেন। এরপর একের পর এক দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত তারকা।
কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-১ গোলের ব্যবধানে বিদায় নিলেও; ৫ ম্যাচে ৬ গোল করে জিতেছিলেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট। সেই হামেস রদ্রিগেজ এবার জাতীয় দলের সঙ্গে দীর্ঘ পথচলার ইতি টেনেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ৩৫ বছর বয়সি এই কলম্বিয়ান তারকা। বিদায়বার্তায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে রদ্রিগেজ লিখেছেন, ‘আজ আমি হৃদয় থেকে কথা বলতে চাই। অনেক বছর, অনেক ম্যাচ, আনন্দ এবং কঠিন মুহূর্তের পর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ করার সময় হয়েছে। সেটি হলো কলম্বিয়া জাতীয় দলের সঙ্গে আমার যাত্রা।’
জাতীয় দলে হামেসের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। মাত্র ২০ বছর বয়সে কলম্বিয়ার জার্সিতে অভিষেক হয় তার। দ্রুতই নিজের প্রতিভার জানান দিয়ে দলে নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। বল পায়ে সৃজনশীলতা, নিখুঁত পাস আর গোল করার সামর্থ্যে হামেস ধীরে ধীরে কলম্বিয়ার আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসায় পরিণত হন।
২০১৪ বিশ্বকাপের পর হামেস রদ্রিগেজের ক্যারিয়ার যেন নতুন গতি পায়। কলম্বিয়ার হয়ে সেই অসাধারণ পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ তাকে দলে ভেড়ায়। গায়ে ওঠে বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি। কার্লো আনচেলত্তির অধীনে প্রথম মৌসুমেই নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দেন তিনি। গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোতেও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। তবে সময়ের সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের একাদশে তার জায়গা নড়বড়ে হয়ে যায়। কোচ পরিবর্তন এবং চোটও তার ছন্দে প্রভাব ফেলে।
রিয়ালে নিয়মিত না হওয়ায় ২০১৭ সালে ধারে বায়ার্ন মিউনিখে পাড়ি জমান হামেস। জার্মান ক্লাবটিতেও নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছিলেন, কিন্তু স্থায়ীভাবে তাকে ধরে রাখেনি বায়ার্ন। এরপর আবার রিয়ালে ফিরলেও পুরোনো জায়গা ফিরে পাননি। শুরু হয় এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে ঘুরে বেড়ানোর সময়। ইংলিশ ক্লাব এভারটনে যোগ দিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন। এরপর কাতারের আল-রাইয়ান, গ্রিসের অলিম্পিয়াকোস ও ব্রাজিলের সাও পাওলোর মতো ক্লাবেও খেলেছেন কলম্বিয়ার এই তারকা।
ক্লাব ক্যারিয়ারে ওঠানামা থাকলেও জাতীয় দলের হয়ে হামেস ছিলেন আলাদা। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় কলম্বিয়াকে দীর্ঘ ২৩ বছর পর ফাইনালে তোলেন তিনি। শিরোপার মঞ্চে মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১-০-তে হারলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেন হামেস। আসরে ৬ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি এক গোল করেন তিনি। যা কোপা আমেরিকার একক কোনো আসরে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড। তা ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপের কমনেবল অঞ্চলের বাছাইপর্বে ৭ অ্যাসিস্ট করে শীর্ষ অ্যাসিস্ট দাতাও ছিলেন তিনি। এরপর বিশ্বকাপের মূল পর্বে তার নেতৃত্বে কলম্বিয়া শেষ ১৬-তে খেলে। গ্রুপ পর্বে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ৩-১, ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে ১-০ ও পর্তুগালের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে কলম্বিয়া। রাউন্ড অব ৩২-এ ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে আসলেও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয় লস কাফেতেরোসদের।
হামেস রদ্রিগেজের পায়ে ভর করেই দলটি পেয়েছে একাধিক স্মরণীয় মুহূর্ত। তবে বয়স, চোট ও ক্যারিয়ারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের অধ্যায়ও থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন হামেস। দেশের হয়ে ১৩১ ম্যাচ খেলে ৩১ গোল ও ৪৩টি অ্যাসিস্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করলেন এ গোল্ডেন বয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা