বসের মুখোমুখি না হয়েই চাকরি ছাড়ার সুযোগ, জাপানে জমজমাট ‘রেজিগনেশন’ ব্যবসা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

জাপানে চাকরি ছাড়ার সময় সরাসরি বসের মুখোমুখি হওয়ার মানসিক চাপ এড়াতে অনেক কর্মী এখন তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিচ্ছেন। নিয়োগকর্তার সঙ্গে

2026-09-17T12:59:22+00:00
2026-09-17T13:06:05+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বসের মুখোমুখি না হয়েই চাকরি ছাড়ার সুযোগ, জাপানে জমজমাট ‘রেজিগনেশন’ ব্যবসা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম  আপডেট: ১৭.০৯.২০২৬ ১:০৬ পিএম
পদত্যাগ সেবা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে জাপানে। ছবি : সংগৃহীত
জাপানে চাকরি ছাড়ার সময় সরাসরি বসের মুখোমুখি হওয়ার মানসিক চাপ এড়াতে অনেক কর্মী এখন তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিচ্ছেন। নিয়োগকর্তার সঙ্গে কর্মীর সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই পদত্যাগের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেওয়ার এই সেবা দেশটিতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে ‘রেজিগনেশন প্রক্সি সার্ভিস’ এখন একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

বিশের কোঠায় থাকা জাপানি তরুণ ওয়াই. এম.-এর অভিজ্ঞতাই এর একটি উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে তিনি একটি আবাসন বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। কিন্তু শুরুতেই চাকরিটি তার জন্য মানসিকভাবে কঠিন হয়ে ওঠে। অফিসে অন্য সহকর্মীদের তুলনায় তাকেই নিয়মিত বসের চিৎকার ও ধমকের মুখে পড়তে হতো।

টোকিওভিত্তিক শ্রম ও মানবসম্পদ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘লিডব্রেন’-এর ওয়েবসাইটে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ওয়াই. এম. জানান, পরিস্থিতি নিয়ে সহকর্মীরা কী ভাববেন, সেটিও তাকে ভাবিয়ে তুলত। একই সঙ্গে তিনি বাবা-মাকে মানসিক দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাননি। কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর সংঘাতেও জড়াতে চাননি তিনি।

এই পরিস্থিতিতে সরাসরি বসের কাছে গিয়ে পদত্যাগপত্র দেওয়ার বদলে তিনি মোবাইল ফোনে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করেন, যারা কর্মীর হয়ে পদত্যাগের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করে। এসব প্রতিষ্ঠান কর্মীর নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পক্ষ থেকে চাকরি ছাড়ার বিষয়টি জানিয়ে দেয়। ফলে, কর্মীকে সরাসরি বসের মুখোমুখি হতে হয় না।


জাপানে কোনো ধরনের আগাম নোটিশ না দিয়ে হঠাৎ কর্মস্থল থেকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে ‘বাক্কুরে’ বলা হয়। আধুনিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিচিত ‘গোস্টিং’-এর সঙ্গে এর কিছুটা মিল রয়েছে। অনেক দেশের দৃষ্টিতে এভাবে কোনো পূর্ববার্তা ছাড়া চাকরি ছেড়ে দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু জাপানের সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি অনেক সময় সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং বাহ্যিক সম্প্রীতি বজায় রাখার একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়।

কর্মস্থল ছাড়তেও দিতে হচ্ছে টাকা

জাপানে পদত্যাগ সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা বাড়ছে। এ খাতের অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালবাট্রস’। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০ জন কর্মীকে কোনো ধরনের সরাসরি সংঘাত ছাড়াই চাকরি ছাড়তে সহায়তা করে।

পূর্ণকালীন কর্মীদের কাছ থেকে প্রতিটি সেবার জন্য অ্যালবাট্রস প্রায় ১২০ ইউরো বা ১৩৮.৫ মার্কিন ডলার নেয়। তাদের অধিকাংশ গ্রাহকই সেবা ও উৎপাদন খাতের তরুণ কর্মী। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিটের মতো।

অ্যালবাট্রসের সিইও ইউকা হামাদা জানান, বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে কর্মীরা তাদের সহায়তা নেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। তার ভাষায়, এসব পরিস্থিতিতে কর্মীরা অনেক সময় এতটাই অসহায় হয়ে পড়েন যে, নিজেরা চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানাতেও সাহস পান না।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘শিকিগাকু’-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, জাপানে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী কর্মীদের প্রতি তিনজনের একজন কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

সম্প্রীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি

জাপানের ঐতিহ্যবাহী করপোরেট সংস্কৃতির বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময়ে। সে সময় ‘আজীবন কর্মসংস্থান’ বা লাইফটাইম এমপ্লয়মেন্ট ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিষ্ঠানের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি আনুগত্যকে সেখানে বিশেষ মূল্য দেওয়া হতো।


ফলে ,অনেক ক্ষেত্রে একজন কর্মীর চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্তকে শুধুই একটি চাকরির চুক্তির সমাপ্তি হিসেবে দেখা হতো না। বরং সেটিকে প্রতিষ্ঠান বা সহকর্মীদের হতাশ করা কিংবা দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখার প্রবণতাও ছিল।

রিকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সোশ্যাল ডিজাইন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক হিরোকি নাকামোরির মতে, জাপানে চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত জানানো অনেক সময় নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয় না। এর সঙ্গে অন্যদের হতাশ করার অনুভূতিও জড়িয়ে থাকে।

হিতোতসুবাশি ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক হিরোশি ওনো বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রের সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে এমন আচরণকে সাধারণত ভালো চোখে দেখা হয় না। তাই কেউ কেউ মনে করতে পারেন, কোনো ধরনের ঝামেলা তৈরি না করে নীরবে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়াই সহজ পথ ‘

তার মতে, দলগতভাবে কাজ করা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখাকে জাপানি কর্মসংস্কৃতিতে শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হয়।

সংঘাত এড়িয়ে চলার এই প্রবণতা জাপানি সমাজে নতুন নয়। সপ্তম শতাব্দীতে প্রণীত ১৭ দফার সংবিধানেও সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিবাদ এড়িয়ে চলার কথা উল্লেখ রয়েছে।


চাকরি ছাড়লেও থাকে সৌজন্যের দায়

তবে, সরাসরি অফিসে গিয়ে বিদায় না জানিয়েও জাপানি কর্মসংস্কৃতির সৌজন্যবোধ পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয় না। অ্যালবাট্রসের সিইও ইউকা হামাদা জানান, কোনো কর্মী যদি নিজে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিদায় জানাতে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে না পারেন, তাহলে তাদের প্রতিষ্ঠান সেই বার্তাটি কর্মীর হয়ে নিয়োগকর্তার কাছে পৌঁছে দেয়।

কর্মী যখন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ না করেই চাকরি ছাড়ছেন, তখনও তিনি ‘মেইওয়াকু’ নামের সামাজিক ধারণাটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর মূল কথা হলো নিজের কারণে অন্যের জন্য যতটা সম্ভব কম সমস্যা তৈরি করা এবং সামষ্টিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

এমনকি কর্মস্থল ছাড়ার সময় নিজের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কীভাবে রেখে যাওয়া হবে, সেটিও এই সামাজিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

হামাদা বলেন, ‘কোনো গ্রাহক যদি কর্মস্থল থেকে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নেন, তবু তারা যেন অফিস ছাড়ার আগে নিজের ডেস্ক পরিষ্কার করে যান-অ্যালবাট্রস সাধারণত এমন পরামর্শই দেয়।’

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   জাপান  রেজিগনেশন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: