গাইবান্ধা জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলার বিতর্কিত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন অবশেষে বিদায় নিয়েছেন। গত দেড় বছর ধরে তার বিরুদ্ধে খাস জমি আত্মসাৎ, সাংবাদিক হেনস্তা, ড্রেজার চুরিসহ অনেক অভিযোগ ছিল।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ছিল মো. জসিম উদ্দিনের শেষ কর্মদিবস। তড়িঘড়ি করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তিনি রওনা দিয়েছেন ঢাকার পথে, যোগ দিতে যাচ্ছেন বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে।
গল্পের শুরু ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর। কুড়িগ্রাম জেলার বাসিন্দা, ৩৮তম বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন সাদুল্লাপুরে যোগ দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে। যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে জমতে শুরু করে অভিযোগের পাহাড়- সরকারি খাস জমি, নামজারি, মিসকেস ও বিভিন্ন মামলার তদন্ত নিয়ে অনিয়ম, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে উগ্র আচরণ ও হয়রানি। সাদুল্লাপুর, জয়েনপুর ও জামুডাঙ্গা মৌজার সরকারি তফসিলভুক্ত অর্পিত সম্পত্তি নিয়েও ওঠে নানা প্রশ্ন।
ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এতটাই জোরালো হয় যে, গত ২০ এপ্রিল প্রথম দফায় তাকে বদলি করা হয় রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায়। কিন্তু জসিম উদ্দিন যেন সেই আদেশ শুনতেই পাননি, তিনি থেকে যান সাদুল্লাপুরেই। এরপর ঘটে আরেক কাণ্ড, যা তাকে রাতারাতি আলোচিত মুখে পরিণত করে।
চলতি বছরের ১৮ জুন। সরকারের অর্পিত সম্পত্তি ব্যক্তি নামে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে ভূমি অফিসে যান সাংবাদিক জিল্লুর রহমান পলাশ ও হেদায়েতুল ইসলাম বাবু। কিন্তু তথ্য দেওয়ার বদলে তাদের সঙ্গে ঘটে তিক্ত অভিজ্ঞতা। চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন জসিম উদ্দিন, প্রকাশ্যে তাদের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আঙুল উঁচিয়ে উগ্র আচরণ করে তাদের বের করে দেন অফিসকক্ষ থেকে। ঘটনার ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সঙ্গে সঙ্গে জসিম উদ্দিনের নাম হয়ে ওঠে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
চাপের মুখে ২১ জুন গাইবান্ধা সার্কিট হাউসে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বসে তদন্ত কমিটি। এর তিন দিনের মাথায়, ২৪ জুন, দ্বিতীয় দফায় তাকে বদলি করা হয় পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। রহস্যজনক কারণে সেই আদেশও থেকে যায় কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায়, আর জসিম উদ্দিন অনিয়মিতভাবে হলেও অফিস চালিয়ে যান সাদুল্লাপুরেই।
স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরত একটাই প্রশ্ন- এতবার বদলির আদেশ হওয়ার পরও কীভাবে টিকে থাকেন এই কর্মকর্তা? জবাব খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে রাজনৈতিক প্রভাবের গল্প। অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার সঙ্গে জসিম উদ্দিনের ছিল ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তৎকালীন ইউএনও কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামের সঙ্গে মিলে হাট-বাজার ইজারা ও খাদ্য ডিলার নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে তিনি খাটিয়েছেন একচেটিয়া প্রভাব- এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। এর প্রতিবাদে ২০২৫ সালের মে মাসে এনসিপির স্থানীয় নেতারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ তোলেন ‘ফ্যাসিস্ট নেতাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা’র।
গল্পের আরেক স্তরে আছে অন্য রাজনৈতিক সমীকরণ। স্থানীয়দের দাবি, জসিম উদ্দিনের আত্মীয়স্বজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, সেই সূত্র ধরেই ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও তিনি উচ্চপর্যায়ের তদবির ও লবিং খাটিয়ে টিকে ছিলেন সাদুল্লাপুরে। দুই আমলেই যেন কোনো না কোনো ‘অদৃশ্য খুঁটি’ তাকে আগলে রেখেছিল- এমনটাই মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল।
জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে উঠেছে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। কুড়িগ্রামে বাড়ি হওয়ায় প্রতি শুক্র-শনিবার তিনি কখনো একা, কখনো স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে সরকারি গাড়িতে চড়ে বাড়ি যাতায়াত করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গাড়িচালক লাভলু মিয়া সরকারি বরাদ্দের জ্বালানি পুড়িয়ে চালিয়ে যেতেন এই ব্যক্তিগত ভ্রমণ।
সাধারণত গাড়িটি সাদুল্লাপুর থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে মাওলানা ভাসানী সেতু এলাকায় যাতায়াত করত, তবে গত সপ্তাহে হঠাৎ রুট পাল্টে সদরের দাড়িয়াপুর হয়ে সেতু এলাকায় যায় গাড়িটি। স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি লক্ষ্য করে গাড়ি আটকে দেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু চালক লাভলু আগেভাগে টের পেয়ে দ্রুত সটকে পড়েন। তবে, স্থানীয়দের মোবাইলে থেকে যায় গাড়ির অবস্থান ও সটকে পড়ার দৃশ্য।
এসবের পাশাপাশি আরও গুরুতর একটি অভিযোগ- অভিযান চালিয়ে জব্দ করা ড্রেজার মেশিনের মালামাল নাকি রাতের আঁধারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
সবশেষ যোগ হয় আরেকটি অভিযোগ- ফ্যামিলি কার্ড শুমারি কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে নিয়োগপ্রত্যাশী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একাংশ বিক্ষোভে নামেন, দাবি তোলেন এসিল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অপসারণের।
গত ২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে অবশেষে টানা পড়ে জসিম উদ্দিনের অধ্যায়ে যতি চিহ্ন। ৩৬ জন এসিল্যান্ডের বদলির তালিকায় ১ নম্বরে থেকে তাকে ন্যস্ত করা হয় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। এবার আর দেরি হয়নি, বুধবার তিনি কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য হন, বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবস পার করে শুক্রবার নিশ্চিত হয় তার সাদুল্লাপুর ত্যাগের খবর।
দীর্ঘদিনের এই বিতর্কিত অধ্যায়ের অবসানে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয় বাসিন্দা ও ভূমিসেবা প্রত্যাশীরা। কিন্তু স্বস্তির পাশাপাশি থেকে গেছে একরাশ প্রশ্নও। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের একটাই দাবি- তিন দফায় বদলির আদেশ সত্ত্বেও কার ইশারায়, কোন অদৃশ্য প্রভাবে এতদিন সাদুল্লাপুরে বহাল ছিলেন জসিম উদ্দিন, তার তদন্ত হোক। সেই সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি, খাস জমি ও অর্পিত সম্পত্তি আত্মসাৎ, সরকারি গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহার এবং জব্দ করা ড্রেজারের মালামাল চুরির প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
সময়ের আলো/মহু