গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ আদালতে জাল জন্মসনদ দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের শিশু সাজিয়ে জামিন করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালতের তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এক আইনজীবীসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জিআরও নিশ্চিত করেছেন, বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে এই আদেশ আদালতে পৌঁছেছে।
জাল জন্মসনদের মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের শিশু সাজিয়ে জামিন করানো, আদালতের অর্ডার শিটের আদেশ কাটাকাটি এবং দীর্ঘ ৯ মাস ধরে একটি মামলার নথি গায়েব রাখার প্রমাণ পাওয়ার পর গাইবান্ধা শিশু আদালত-২-এর বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ জেলা বারের আইনজীবী, গোবিন্দগঞ্জ কোর্টের সাবেক জিআরওসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে থানায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে দেশের সামগ্রিক বিচার বিভাগের ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে।
একটি গ্রেফতার থেকে যেভাবে খুলে গেল জালিয়াতির জট
গল্পের শুরুটা একজন হ্যাকারকে ঘিরে। গত বছরের ১৫ জুলাই যৌথ বাহিনীর অভিযানে শ্বশুরবাড়ি গোবিন্দগঞ্জ থেকে গ্রেফতার হন হ্যাকার চক্রের সদস্য পলাশ রানা। মামলার এজাহারে স্পষ্ট লেখা ছিল তার বয়স ২৫ বছর। কিন্তু আদালতে জামিনের সময় হাজির হলো ভিন্ন এক নথি- জাল জন্মসনদ, যেখানে পলাশ রানাকে দেখানো হলো নাবালক হিসেবে। এই কারসাজির নেপথ্যে ছিলেন তার আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপন।
বিষয়টি প্রথম চোখে পড়ে সহকর্মী আইনজীবীদের। জেলা বারের আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুলসহ কয়েকজন এই অসংগতি আদালতের নজরে আনেন। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর আদালতপাড়ায় শুরু হয় তোলপাড়। তখনই একে একে খুলতে থাকে জালিয়াতির জট। দেখা যায়, পলাশ রানার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন কাণ্ড নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি প্যাটার্নের অংশমাত্র।
তিন-তিনটি মামলায় একই কৌশল
বিষয়টি খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পড়ে গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসানের ওপর। গত ১৯ আগস্ট তিনি শিশু আদালতে তার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
গোবিন্দগঞ্জ থানার জিআর মামলার নথি ঘেঁটে দেখা যায়, ৪ আসামির মধ্যে শাওন মিয়া, শামীম চৌধুরী ও এনামুল হক- তিনজনই প্রাপ্তবয়স্ক। অথচ জাল জন্মসনদ ও ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে আইনজীবী রিপন তাদের শিশু হিসেবে চালিয়ে দিয়ে শিশু আদালত-২ থেকে জামিন করিয়ে নেন। ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে অন্য দুটি মামলাতেও। একই কৌশলে প্রাপ্তবয়স্ক ও এমনকি বিবাহিত আসামিদেরও শিশু বানিয়ে জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। অনলাইন সার্ভারে যাচাই করে দেখা যায়, জামিনের সময় দাখিল করা প্রতিটি জন্মসনদই ছিল ভুয়া ও জাল।
অপরাধ ঢাকতে আরেকজনকে ফাঁসানোর চেষ্টা
নিজের জালিয়াতি আড়াল করতে গিয়ে আইনজীবী রিপন এবার টার্গেট করেন এক নিরপরাধ সহকর্মীকে। মামলার প্রাপ্তবয়স্ক আসামি আশিক মিয়াকে একই কৌশলে শিশু সাজিয়ে জামিন করানোর পর তিনি নিজের দাখিল করা জামিননামা, বেল বন্ড ও জাল জন্মসনদ সব সরিয়ে ফেলেন আদালতের নথি থেকে। তার বদলে সেখানে জুড়ে দেন তাছলিমা খাতুন নামে আরেক আইনজীবীর জাল স্বাক্ষরযুক্ত ওকালতনামা ও বেল বন্ড।
তাছলিমা খাতুন সবে ২০২৩ সালে বার কাউন্সিল থেকে লাইসেন্স পাওয়া একজন নবীন আইনজীবী। অথচ তার অজান্তেই তার সিল ও স্বাক্ষর জাল করে জামিনের দরখাস্ত, ওকালতনামা ও বেল বন্ড আদালতে দাখিল করেন রিপন।
তদন্তে বেরিয়ে আসে এই জালিয়াতির আরও একটি চমকপ্রদ প্রমাণ- সময়ের হিসাবেই ধরা পড়ে যায় মিথ্যা। তাছলিমার জাল স্বাক্ষরযুক্ত যে ওকালতনামাটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি গাইবান্ধা বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে বিক্রি হয় ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট। অথচ সেই একই ওকালতনামা দেখিয়ে আসামির জামিন করানো হয় তারও চার দিন আগে, ১০ আগস্ট। অর্থাৎ যে কাগজ তখনো বাজারেই আসেনি, সেই কাগজ দিয়েই সারা হয়ে গিয়েছিল জামিনের কার্যক্রম। বিষয়টি ধরা পড়ার পর আদালতের নির্দেশে আইনজীবী রিপন ও তার মুহুরি হাসান আলীর বিরুদ্ধে গাইবান্ধা সদর থানায় দায়ের হয় একটি ফৌজদারি মামলা।
জেরার মুখে নিরুত্তর আইনজীবী
তদন্তে ন্যায়বিচারের মূলনীতি মেনে ‘কাউকে না শুনে দণ্ড দেওয়া যাবে না’- এই আপ্তবাক্য অনুসরণ করে সব পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। জবানবন্দিতে আইনজীবী রিপনের দাবি ছিল, তিনি কেবল বেল বন্ডে স্বাক্ষর করেছেন মাত্র, ওকালতনামা বা জামিনের আবেদনে তার কোনো স্বাক্ষর নেই। কিন্তু ওকালতনামা ছাড়া তিনি জামিন শুনানিতে অংশ নিলেন কীভাবে? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি রিপন।
তার মুহুরি হাসান আলী স্বীকার করেন, রিপনের সহকারী হিসেবে কাজ করার কথা, তবে আদেশনামায় কাটাকাটির দায় অস্বীকার করেন তিনি। অন্যদিকে, গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের তৎকালীন জিআরও আব্দুস সবুর নথিতে কাটাকাটির বিষয়টি স্বীকার করলেও দাবি করেন, শিশু আদালতে নথি হস্তান্তরের সময় কোনো কাটাকাটি ছিল না বলেই তার ধারণা। ৯ মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই নথি গায়েব থাকার প্রশ্নেও স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।
‘বিচার বিভাগের জন্য কালো অধ্যায়’
বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার পেতে সহায়তা করাই একজন আইনজীবীর প্রধান দায়িত্ব। অথচ সেই দায়িত্ব পালনের বদলে সহকর্মী এক নারী আইনজীবীর স্বাক্ষর জাল করে ও গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে আসামি জামিন করানোর এই ঘটনাকে আদালত আখ্যা দিয়েছে দেশের সামগ্রিক বিচার বিভাগের জন্য ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে।
সে অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদনে পেশাগত শপথ ভঙ্গ ও ধারাবাহিক জালিয়াতির অভিযোগে অ্যাডভোকেট শেফাউল ইসলাম রিপনের আইনজীবী সনদ অবিলম্বে বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই চক্রের অন্যতম সহযোগী মুহুরি হাসান আলীর গাইবান্ধা জেলা আইনজীবী সমিতিতে কাজ করার অনুমতিপত্রও বাতিলের সুপারিশ করা হয়। নথি গায়েব রাখা ও সংরক্ষণে চরম অবহেলার দায়ে তৎকালীন জিআরও আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ জানানো হয়েছে।
অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় অভিযুক্ত তিনজনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গত ১৯ আগস্ট শিশু আদালত-২, গাইবান্ধায় তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান বিচারক এসএম গালিব হাসান। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই বিচারক মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চসহকারীকে বাদী করে থানায় মামলা দায়েরের নির্দেশ দেন।
জালিয়াতি ফাঁস করতে গিয়েই হয়রানির শিকার
এই জালিয়াতি ফাঁস করাটা সহজ ছিল না বলেই দাবি জেলা বারের আইনজীবী সরওয়ার হোসেন বাবুলের। তিনিসহ কয়েকজন আইনজীবী যখন প্রথমে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন, এরপর আদালতের নির্দেশে রিপনের বিরুদ্ধে সদর থানায় দুটি মামলা দায়ের হয়, যার তদন্তভার পান গাইবান্ধা সদর থানার উপপরিদর্শক সুদীপ্ত শাহীন। কিন্তু বাবুলের অভিযোগ, প্রকৃত অভিযুক্তকে গ্রেফতার না করে উল্টো তাকেই একটি মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে হয়রানি করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। দীর্ঘ ২২ দিন হাজতবাসের পর অবশেষে জামিনে মুক্তি পান বাবুল।
জালিয়াতির জট এখন আদালতের নির্দেশে থানার হাতে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- এমন সংগঠিত জালিয়াতি এত দিন কীভাবে ধরা পড়েনি? এর নেপথ্যে সত্যিই কি শুধু ৩ জনই জড়িত, নাকি জড়িত আরও কেউ?
সময়ের আলো/মহু