চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিরল খনিজ পদার্থ বা রেয়ার আর্থের নির্ভরতা আগামী দশকেও অব্যাহত থাকবে। ফলে বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বসার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গুরুত্বপূর্ণ এক অসম অবস্থানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
খনিজবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দুটি বিরল খনিজ পদার্থ উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। তবে দেশটি বর্তমানে নিজেদের চাহিদার মাত্র ৪২ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। আগামী পাঁচ বছর পরও চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিরল খনিজ পদার্থ উৎপাদক ও পরিশোধনকারী দেশ চীন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতার অংশ হিসেবে বিরল মাটি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ ১০ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছিল বেইজিং। ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-সি বৈঠকে এই স্থগিতাদেশ আরও বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় থাকতে পারে।
এদিকে চীনা বিরল খনিজ পদার্থ আমদানি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তবে শিল্পের বর্তমান সক্ষমতা বিবেচনায় সেই লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
আইএনজির বিশ্লেষক কোকো ঝাং বলেন, চীনের জায়গায় বিশ্বের প্রধান সরবরাহকারী হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নয়। বরং ভূরাজনৈতিক সংকটের সময়ে কৌশলগত খাতগুলোকে সুরক্ষা দিতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাই বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
ক্ষমতায় ফেরার পর বিরল মাটিকে জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার দিয়েছেন ট্রাম্প। এ খাতের সক্ষমতা বাড়াতে এমপি ম্যাটেরিয়ালস, ইউএসএ রেয়ার আর্থ ও এনার্জি ফুয়েলসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এসব উদ্যোগের সুফল মিলতে শুরু করলেও আমদানিনির্ভরতা এখনো রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে আছে ‘হেভি রেয়ার আর্থ’ প্রক্রিয়াজাতকরণ। সামরিক কাজে ব্যবহৃত এসব বিশেষায়িত খনিজের প্রক্রিয়াজাতকরণ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় হয়ই না। বেঞ্চমার্কের তথ্য বলছে, ২০৩১ সালের মধ্যে এ ধরনের খনিজের উৎপাদন বাড়লেও তা দেশটির চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হবে না।
বিরল মাটির প্রক্রিয়াজাতকরণে ১৭টি পৃথক খনিজকে একে অন্যের থেকে আলাদা করার রাসায়নিক ও যান্ত্রিক জটিলতা রয়েছে। ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থাজুড়ে চীনা সরবরাহ প্রতিস্থাপন করা অনেক বেশি কঠিন বলে মনে করেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট ব্লুর খনিজ বিশ্লেষক টড ডাউনিং।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোও দ্রুত এগোচ্ছে। এমপি ম্যাটেরিয়ালস চলতি মাসের শুরুতে নিজেদের পরিশোধিত বিরল খনিজ পদার্থ দিয়ে তৈরি চুম্বক জেনারেল মোটরসকে সরবরাহ শুরু করেছে। ইউএসএ রেয়ার আর্থ এ বছর ব্রাজিলের একটি খনি ও ফ্রান্সের একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা কিনেছে। এনার্জি ফুয়েলসও দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় বড় একটি চুম্বক কারখানা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কেনার চুক্তি করেছে।
ক্লিয়ার স্ট্রিটের বিরল মাটি বিশ্লেষক টিম মুর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ পদার্থ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ফিরিয়ে আনার কাজ এগোচ্ছে। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও কার্যক্রম চলছে।
এ ছাড়া এনথ সাইকেল, ইউকোর রেয়ার মেটালসসহ বিভিন্ন স্টার্টআপ বিরল মাটি পরিশোধনের নতুন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের সংগঠন জেটার প্রধান আলবার্ট গোর বলেন, সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে উপকরণ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অগ্রগতি করছে।
তবে চীনের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে কিছু চীনা সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ পদার্থ পাঠানো কমিয়ে দিয়েছে। বেইজিংয়ের অসন্তোষের আশঙ্কায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছিল। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানি বন্ধ করলে মার্কিন নির্মাতাদের ওপর এর আরও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
গত বছর চীন থেকে বিরল খনিজ পদার্থের সরবরাহ কমে যাওয়ার পর ফোর্ড মোটর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল।
এনথ সাইকেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেগান ও’কনর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা যত দ্রুত সম্ভব গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্টরা কঠোর পরিশ্রম করছেন। এ প্রতিষ্ঠান চলতি সপ্তাহে খনিজ সরবরাহের জন্য গ্লেনকোরের সঙ্গে ১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।
সময়ের আলো/কেএইচ