ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, প্রস্তাবটি পাওয়ার পর ট্রাম্প তা নাকচ করে দেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের ওপর আবারও হামলা চালানোর বিষয়ে সহযোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এর আগে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা সম্ভব। প্রস্তাবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন হরমুজকে ঘিরে অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ইরানের প্রস্তাবে কী ছিল?
আরাগচির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের প্রস্তাবটি জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি। এতে সাত দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইরানের জব্দ করা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছাড়, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া। লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার শর্ত রয়েছে।
ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব শর্ত বাস্তবায়ন শুরু হলে সপ্তম দিনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হতে পারে। আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেই সময়সূচি কার্যকর হবে।
ওয়াশিংটনের অবস্থান কী?
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি। তবে *দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল*-এর প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো বাস্তবে পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সংশয় রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করাও ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ দাবির মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান বলছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
কূটনৈতিক যোগাযোগ কি বন্ধ হয়ে গেছে?
না। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবর এলেও মধ্যস্থতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে কাতার দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা রাখছে।
এর আগে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্পও আগের একটি বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো ও নতুন করে সংলাপ শুরুর বিষয়ে কথা বলেছেন বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এরপর কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে পরবর্তী পদক্ষেপের কয়েকটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে। প্রথমত, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন কোনো সমঝোতার চেষ্টা হতে পারে। ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলেও সেটি নিয়ে আরও আলোচনা শুরু হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এই নৌপথ দিয়ে শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। ফলে এর ওপর দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, সামরিক উত্তেজনা আবার বাড়তে পারে। *দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল* জানিয়েছে, ট্রাম্প সহযোগীদের বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও বোমা হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এটি অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন; ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এটিকে দেখা যাচ্ছে না।
হরমুজই এখন বড় চাপের জায়গা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধে হরমুজ প্রণালি এখন অন্যতম প্রধান কৌশলগত ইস্যু। একদিকে ইরান বলছে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে নৌপথটি খুলে দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ওয়াশিংটন প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ফলে সামনে কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন চেষ্টা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কিংবা সামরিক উত্তেজনা—তিন পথই খোলা রয়েছে। কোন পথে পরিস্থিতি যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী শর্ত, মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির ওপর।
সময়ের আলো/টিকে