জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে এক সপ্তাহ ধরে বিশ্বনেতাদের ব্যস্ততা, বৈঠক ও কূটনৈতিক তৎপরতা চলেছে। তবে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধসহ বড় কোনো সংকটের সমাধানে বড় অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে এই সপ্তাহের ছয়টি বড় বিষয় উঠে এসেছে।
১. ইরান নিয়ে আবার কূটনৈতিক আলোচনা
জাতিসংঘের অধিবেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়া।
জুলাইয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর এই প্রথম দুই দেশের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মধ্যে এ যোগাযোগ হয়।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, আলোচনা চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তবে দুই দেশের নেতারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন।
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু রাখার বিষয় রয়েছে।
তবে দ্রুত কোনো চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, চুক্তিতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন আলোচনা প্রয়োজন হবে।
২. ইউক্রেনের শস্য ও জ্বালানি নিয়ে সীমিত যুদ্ধবিরতির আলোচনা
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও কিছুটা কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে।
মার্কো রুবিও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর রুবিও জানান, ইউক্রেন ও রাশিয়া শস্য পরিবহন এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা সীমিত করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
শীত আসার আগে ইউক্রেন ও তার মিত্ররা জ্বালানি অবকাঠামো এবং কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে সীমিত কিছু সমঝোতা করতে চাইছে। কারণ শীতের সময় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থায় রুশ হামলা বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছে।
তবে রুবিওর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে লাভরভের বক্তব্যে বড় কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
৩. জলবায়ুর জায়গা দখল করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক অধিবেশনগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন বড় আলোচনার বিষয় থাকলেও এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এআই নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু নিরাপত্তা সমস্যা এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গবেষকদের সতর্কবার্তার কারণে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
জাতিসংঘের একটি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে অংশ নেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। তারা এআই নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের সরকারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজিও জানান, জুন মাসে ওপেনএআইয়ের তৈরি একটি এআই এজেন্ট অস্ট্রেলিয়া সরকারের একটি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে সরকারি ও অপ্রকাশ্য কিছু ফাইল দেখেছিল।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআইকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো বৈশ্বিক উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি এআইকে অসাধারণ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে।
৪. ভেনেজুয়েলার নেতার আকস্মিক উপস্থিতি
জাতিসংঘে সবচেয়ে চমকপ্রদ উপস্থিতিগুলোর একটি ছিল ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নিউইয়র্ক সফর। ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ট্রাম্পের সঙ্গে রদ্রিগেজের এটিই ছিল প্রথম সরাসরি বৈঠক।
ভেনেজুয়েলার প্রতিনিধি দলের আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল দেশটির বিপুল বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন। এ নিয়ে তারা মার্কিন কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেন।
ট্রাম্প তার বক্তব্যে ভেনেজুয়েলা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন এবং দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক তেল চুক্তির প্রশংসা করেন। এদিকে ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো নিজ দেশে ফেরার জন্য তিনবার চেষ্টা করেও সফল হননি।
৫. সুদানের সেনাপ্রধানের অনুপস্থিতি
জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে বড় একটি অনুপস্থিতিও নজর কেড়েছে। সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান নিউইয়র্কে আসতে পারেননি।
যুক্তরাষ্ট্র তার ভিসা দেয়নি। সুদানের বিভিন্ন সূত্রের মতে, এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের সম্পর্ক রয়েছে। খার্তুম ওই প্রস্তাব মেনে নেয়নি।
সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধকে জাতিসংঘ বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে। ফলে বুরহানের অনুপস্থিতি ওয়াশিংটন ও সুদানের সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরেকজন উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিত ছিলেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তিনি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে জাতিসংঘে বক্তব্য দেন এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি মিশনের প্রবেশাধিকারে যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধের সমালোচনা করেন।
৬. জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ এখন অর্থনৈতিক সংকট, কমতে থাকা প্রভাব এবং বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক রিচার্ড গোয়ান বলেছেন, জাতিসংঘ হয়তো আর দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে না, তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্যে রয়েছে।
ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প জাতিসংঘকে বড় ও ‘গ্লোবালিস্ট’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমালোচনা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমানোর পাশাপাশি বেশ কিছু জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। সাধারণ পরিষদে তার শেষ ভাষণের পর তিনি দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা পান।
নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। একাধিক ধাপ ও গোপন ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করা হচ্ছে। এখনো কোনো প্রার্থীকে স্পষ্টভাবে এগিয়ে থাকা বলা যাচ্ছে না। তবে কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান এবং জাতিসংঘে গায়ানার রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বার্কেট আলোচনায় রয়েছেন।
নতুন মহাসচিবকে এমন একটি জাতিসংঘের দায়িত্ব নিতে হবে, যা একই সঙ্গে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব কমে যাওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
সময়ের আল/ইউএমএইচ