মধ্যপ্রাচ্যে সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন আবারও কূটনীতির পরীক্ষায়। ইরান স্পষ্ট করে বলছে, যুদ্ধের সমাধান সামরিক পথে নয়, আলোচনার টেবিলেই হতে হবে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাবিত সমঝোতা প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়েছেন। ফলে একদিকে যেমন সংঘাত অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি আবার সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথটি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলবাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতেও। ইরান এখন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আলোচনায় সত্যিকারের আগ্রহ দেখায় এবং সামরিক চাপ কমায়, তাহলে হরমুজ খুলে দেওয়ার পথও তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য তেহরানের নির্দিষ্ট শর্ত মানতে হবে।
সাত দিনের প্রস্তাব
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি প্রস্তাবের কথা জানান। কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে ওই প্রস্তাব পৌঁছেছে বলে জানায় তেহরান। প্রস্তাবটির মূল কথা হলো—যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায় রাজি হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। এরপর উভয়পক্ষ পারস্পরিকভাবে সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনায় বসতে পারবে।
আরাগচির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমঝোতার ব্যাপারে আন্তরিকতা দেখা গেলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি তেহরানের রয়েছে। অর্থাৎ ইরান হরমুজকে কেবল সামরিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে না; এটিকে কূটনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবেও ব্যবহার করতে চাইছে। তবে প্রস্তাবটির সঙ্গে তেহরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কমানো, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া, আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় এবং তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার করা। বিনিময়ে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত থামানোর আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান
তবে ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেও পুরোপুরি বন্ধ নয় আলোচনার দরজা। ইরানের প্রস্তাবের পর পরিস্থিতি কিছুটা আশাব্যঞ্জক মনে হলেও তা দ্রুত জটিল হয়ে যায়। ট্রাম্প প্রকাশ্যে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, হরমুজ খুলে দেওয়ার জন্য ইরানই এখন চুক্তি করতে চাইছে এবং তেহরানের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আরাগচি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীরা এখনও ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যানের আনুষ্ঠানিক বার্তা তেহরানকে দেয়নি। ফলে ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের বাস্তব অবস্থার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। ইরান বলছে, তারা মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবস্থান জানার অপেক্ষায় রয়েছে। এ কারণেই ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানকে আলোচনার সম্পূর্ণ সমাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ এখনই নেই। বরং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের পথটি খোলা আছে কি না, সেটিই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
ইরানের অবস্থানও কঠোর
কূটনৈতিক সমাধানের কথা বললেও পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্নে ইরান যে বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়, সেটিও স্পষ্ট করেছে তেহরান। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রস্তাবে রাজি হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরান তার অধিকার থেকে সরে যাবে না। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোর বিষয়ে তেহরান কোনো ছাড় দিতে চায় না।
অর্থাৎ ইরানের কাছে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির প্রশ্ন দুটি আলাদা বিষয় হলেও ভবিষ্যৎ সমঝোতায় দুটিই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে আসতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসতে তেহরান প্রস্তুত। তবে তিনি কোনো ধরনের চাপ বা জবরদস্তি মেনে নেবেন না বলে জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না এবং এ বিষয়ে তারা আগেই অবস্থান জানিয়েছে।
যুদ্ধের মূল প্রশ্ন এখন পারমাণবিক কর্মসূচি
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কমানো যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে। এর সঙ্গে ইরানের প্রতিবেশীদের ওপর হামলার সক্ষমতা কমানো এবং দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যও রয়েছে।
কিন্তু এখানেই আলোচনার সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন যদি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কঠোর সীমা আরোপ করতে চায়, আর তেহরান যদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকারকে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার হিসেবে ধরে রাখে, তাহলে সমঝোতার সেতুটি কোথায় তৈরি হবে, এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, তেহরান যুদ্ধ বন্ধের জন্য আলোচনায় বসতে রাজি, কিন্তু যুদ্ধের চাপে নিজের পারমাণবিক কর্মসূচির মৌলিক অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি নয়। ফলে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তিতে নিরাপত্তা, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও পারমাণবিক কর্মসূচি, সবগুলো বিষয়কে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
হরমুজ এখন যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনীতিরও প্রশ্ন
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাত মাসের সংঘাত ইতিমধ্যে বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে সৌদি আরবের যোগাযোগও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দুই দেশ দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও হরমুজ পরিস্থিতি তাদের একই বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। কারণ প্রণালিটি অস্থিতিশীল থাকলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রফতানি, বাণিজ্য ও অর্থনীতি—সবকিছুর ওপরই চাপ বাড়ে।
ইরানের প্রস্তাব তাই শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ।
সাত মাস ধরে যুদ্ধ, তবু শেষের দেখা নেই
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা দিয়ে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সংঘাত কখনো থেমেছে, আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে, ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
একই সঙ্গে ইরান ও তার মিত্ররা সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে দিয়েছে। ইরানের মিত্র হুথিরাও ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এখন আর কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগর, ইয়েমেন, লেবানন ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে।
সবশেষ ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশেও নতুন করে প্রাণহানির খবর এসেছে। রোববার মাওইয়া জংশনের একটি বাজার এলাকায় হামলায় সাতজন নিহত ও ৪০ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে হুথি নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে ইয়েমেন সরকার বলেছে, তাদের বাহিনী ওই এলাকায় হুথিদের একটি সামরিক ঘাঁটি ও যানবাহন লক্ষ্য কর পেরিয়েও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকেে দেওয়া, যুদ্ধ থামানো এবং এরপর বিস্তৃত আলোচনায় যাওয়ার একটি ধাপভিত্তিক কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন এখনও ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের খবর রয়েছে। এর অর্থ, রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর বলে জানানো হয়েছে।
তবে হামলার লক্ষ্য নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার বলেছে, তাদের বাহিনী ওই এলাকায় হুথিদের একটি সামরিক ঘাঁটি ও যানবাহন লক্ষ্য করেছিল।
কূটনীতির জানালা এখনও খোলা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের এত দীর্ঘ পথ পেরিয়েও কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকে কেন্দ্র করে ইরান আবার আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।
তেহরানের প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজ খুলে দেওয়া, যুদ্ধ থামানো এবং এরপর বিস্তৃত আলোচনায় যাওয়ার একটি ধাপভিত্তিক কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন এখনও ইরানের ওপর চাপ বজায় রেখেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগের খবর রয়েছে। এর অর্থ, রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক, কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনাটি পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
এখন মূল প্রশ্ন হলো— উভয়পক্ষ কি নিজেদের সর্বোচ্চ দাবির জায়গা থেকে কিছুটা সরে এসে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে, যেখানে ইরান তার সার্বভৌম অধিকার ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিশ্চয়তা পাবে, আর যুক্তরাষ্ট্র পাবে পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে কাঙ্ক্ষিত নিশ্চয়তা?
ইরানের বর্তমান বার্তা হলো— যুদ্ধ নয়, আলোচনাই সমাধানের পথ। কিন্তু সেই আলোচনায় বসার দরজা খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের শর্ত বিবেচনা করতে হবে। আর ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, হরমুজ ও যুদ্ধবিরতির প্রশ্নে চাপের বিনিময়ে বড় ধরনের ছাড় আদায় করা।
ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও পথটি এখনও দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত। হরমুজ খুলবে কি না, মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কী হবে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে, এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে সাত মাসের এই যুদ্ধ সত্যিই কূটনীতির টেবিলে গিয়ে থামবে, নাকি আবারও ফিরে আসবে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার শব্দ।
আমি মূল তথ্য, নাম, সংখ্যা, উদ্ধৃতি ও বক্তব্যের অবস্থান পরিবর্তন করিনি; মূলত আপনার দেওয়া কপির বিকৃত অক্ষর ও টাইপোগুলো ঠিক করেছি এবং পাঠযোগ্যতা বজায় রেখেছি।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ