মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের হাজারো মানুষের সামনে অবশেষে হাতছানি দিচ্ছে নতুন আশার আলো। বছরের পর বছর যে নিমজ্জিত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে নদীযান চলেছে, সেখানেই এখন জেগে উঠছে বিস্তীর্ণ চর। হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ডে সবুজ ঘাসের দেখা পেয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুনছেন নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। তবে, চাষাবাদের প্রস্তুতির মধ্যেই এই নতুন চর ঘিরে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দখলের পাঁয়তারায় চরম সংশয় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে কমলনগর উপজেলার প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ২০১৩-১৪ সালের দিকে চর কালকিনি ও সাহেবেরহাট ইউনিয়ন দুটি প্রায় পুরোপুরি মানচিত্র থেকে মুছে যায়। এছাড়া চর ফলকন, পাটওয়ারীরহাট ও চর লরেন্স ইউনিয়নের বড় একটি অংশ নদীতে তলিয়ে গেলে ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করে।
সম্প্রতি সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় বিশাল এলাকাজুড়ে নতুন চর জেগে উঠেছে। এর ৫ বছর আগে 'কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর' এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমি দৃশ্যমান হয়। কিন্তু চর জেগে ওঠার পরপরই শুরু হয়েছে দখলের প্রতিযোগিতা।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের অভিযোগ, 'কটোরিয়া ও কাঁকড়ার চর' এর জমি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এককভাবে দখলে নেয় স্থানীয় একটি ‘মাতব্বর’ চক্র। চার বছর ধরে তা ভোগদখল করার পর চলতি বছর চরটি ভোলার চরফ্যাশনের বাসিন্দা সকেট জামালের কাছে ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এবার সেই চক্রটির নজর পড়েছে দক্ষিণ জগবন্ধু সীমানায় নতুন জেগে ওঠা ভূখণ্ডের ওপর। নিজস্ব কোনো মালিকানা না থাকা সত্ত্বেও কেবল গায়ের জোরে চরটি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।
জবরদখল রুখতে ও নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে ইতোমধ্যে একত্রিত হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। গঠন করা হয়েছে ‘চর জগবন্ধু, ফলকন ও পাটারিরহাট ভূমিমালিক ঐক্য পরিষদ’।
দক্ষিণ জগবন্ধু ভূমিমালিক সমিতির সভাপতি জহির উদ্দিন রিয়াজ বলেন, সাহেবেরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ জগবন্ধুর নিজস্ব সীমানায় নতুন চর জেগে উঠেছে। এতে মাতব্বরদের কোনো জমি নেই। প্রকৃত ভূমিমালিকেরা যেন এখানে শান্তিপূর্ণভাবে চাষাবাদ করতে পারেন, আমরা সেই চেষ্টা করছি।
পাটওয়ারীরহাট ইউনিয়নের ভূমিমালিক সমিতির নেতা জাহাঙ্গীর মেম্বার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হলেও মাতব্বর গোষ্ঠী ও একটি প্রভাবশালী গ্রুপ জমিগুলো জবরদখলের পাঁয়তারা করছে।
সাহেবেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর মো. মাসুদ অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাতব্বররা একটি চর দখল করে সুবিধা নিয়েছে। এখন তারা প্রকৃত ভূমিমালিকদের বঞ্চিত করে দক্ষিণ জগবন্ধুর নতুন চরটিও দখলের চক্রান্ত করছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মাতাব্বর বংশের প্রতিনিধি খোকন মাতব্বর বলেন, যে চরটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটি আমাদের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনদের চাষাবাদি জমি। নতুন জেগে ওঠা চরেও আমাদের বসতবাড়ি ছিল, তাই সেখানে আমাদের দাবি থাকা স্বাভাবিক। ৩৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, সেখানে অন্য কারও জমি না থাকায় বিষয়টি তাদের নিজস্ব এক্তিয়ারভুক্ত।
এ প্রসঙ্গে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাহাত উজ জামান জানান, চর পুরোপুরি জেগে উঠলে সরকারিভাবে জরিপ পরিচালনা করা হবে এবং বিধি অনুযায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া হবে। এর আগে চরের ওপর কারও একক মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। পুরো বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সময়ের আলো/আতা