ডাচ ফুটবলের ইতিহাসে এক রূপকথার গল্প লিখেছিলেন দুই বন্ধু—রুদ গুলিত এবং ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড। তারা দুজন ছিলেন যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। গুলিত ছিলেন উত্তাল আগুন, আর রাইকার্ড শান্ত বরফ। নেদারল্যান্ডসের একমাত্র ইউরো জয় থেকে শুরু করে এসি মিলানের অপরাজেয় দল, ডাচ ফুটবলের উত্থান-পতন আর আবেগের পুরো গল্পটাই আটকে আছে এই দুজন মানুষের সমান্তরাল জীবনের ভেতর।
গল্পটার শুরু সুরিনাম থেকে আসা দুই বাবার হাত ধরে। গুলিত আর রাইকার্ড— দুজনের জন্মই ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে। তখনকার দিনে নেদারল্যান্ডসে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। দলজুড়ে নিজেদের আলাদা দেখতে লাগায় দুজনেই জানতেন— সবাই তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে, তাই মাঠে সেরাটা দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তারা ছিলেন রাস্তার ফুটবলার—যাকে বলে ‘স্ট্রিট ফুটবলার’। আমস্টারডামের বালবোয়াপ্লেন স্কয়ারের ধূলিমলিন মাঠে বল নিয়ে মেতে থাকতেন দুই কিশোর। পনেরো বছর বয়সে মাথায় প্রায় একই রকম আফ্রো হেয়ারস্টাইল আর লম্বা চওড়া শরীর নিয়ে তারা খুব সহজেই বড় বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন।
গুলিত ছিলেন কিছুটা বাউন্ডুলে প্রকৃতির, যিনি ডিফেন্স থেকে বল কেড়ে নিয়ে ঝড়ো গতিতে প্রতিপক্ষের অ্যাটাকিং থার্ডে ঢুকে যেতেন। আর রাইকার্ড ছিলেন শান্ত ও ঠান্ডা মাথার—যিনি টেকনিক্যালি ছিলেন ভীষণ তীক্ষ্ণ, নেপথ্যে থেকে ম্যাচের সব জটিলতা সামলে নিতেন। হ্যারলেমের হয়ে খুদে গুলিত যখন আলো ছড়াচ্ছেন, রাইকার্ড তখন তৈরি হচ্ছেন আইয়াক্সে— কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুয়েফের পরম স্নেহে। ১৯৮১ সালে জাতীয় দলে দুজনের অভিষেকও হয় একই ম্যাচে!
এরপর গুলিত গেলেন ফেইনুর্দে, পরে রেকর্ড মূল্যে পিএসভি আইন্দহোভেনে। সেখান থেকে তাকে বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে নিজেদের তাঁবুতে টেনে নিল এসি মিলান। অন্যদিকে রাইকার্ডও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে গুরু ক্রুয়েফের মূল অস্ত্র হয়ে উঠলেন, যদিও পরে বিতর্কে জড়িয়ে স্পেনে পাড়ি জমাতে হয়েছিল তাকে। তবে তাদের এই আলাদা পথগুলোকে আবারো এক বিন্দুতে মেলায় ১৯৮৮ সাল।
জাতীয় দল নেদারল্যান্ডসের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয় আর পরবর্তীতে এসি মিলানে কোচ আরিগো সাকির অপরাজেয় দলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন এই দুজন। মিলানের জার্সিতে পরপর দুটি ইউরোপিয়ান কাপ জয়ে গুলিতের তেজ আর রাইকার্ডের অনবদ্য অল-রাউন্ড পারফরম্যান্স ফুটবল বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।
ফুটবলের ইতিহাস যুগে যুগে অনেক বন্ধুত্বের গল্প বলবে, কিন্তু এই দুই বন্ধুর মতো এক সঙ্গে পথ চলা, একে অপরের পরিপূরক হওয়া আর পুরো একটা দেশের ফুটবলকে এভাবে বদলে দেওয়ার গল্প... ইতিহাসে আর দুটো পাওয়া যাবে না!
সময়ের আলো/কেআই