বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাণিজ্য থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মাদকবিরোধী সহযোগিতা থেকে আন্তর্জাতিক জলপথ—বিভিন্ন বিষয়ে আট দফা সমঝোতা হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব সমঝোতার বিস্তারিত জানায়। একই দিন রয়টার্সও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শি জিনপিং ২৩ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তিয়ন ডলার মূল্যের ‘অসংবেদনশীল’ পণ্যে আরওরাষ্ট্র সফর করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে শুল্ক সুবিধা
বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল বাণিজ্য। দুই দেশ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ‘অসংবেদনশীল’ পণ্যে আরও সুবিধাজনক শুল্ক ব্যবস্থার সুপারিশে একমত হয়েছে।
তবে এর অর্থ ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে পুরোপুরি শুল্ক প্রত্যাহার নয়। বরং উভয় দেশের প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যকে বিশেষ সুবিধাজনক শুল্ক কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
সম্ভাব্য পণ্যের তালিকায় মার্কিন কৃষিপণ্য, কাঠ ও প্রসাধনী এবং চীনের ছোট গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, খেলনা ও সাজসজ্জার সামগ্রী থাকতে পারে।
এ ছাড়া দুই দেশ একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিষদের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও একমত হয়েছে। নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকা বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদও আরও দুই মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আট দফা সমঝোতায় যা আছে
প্রথম দফায়, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে স্থিতিশীল ও গঠনমূলক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় দফায়, এপেক ও জি২০ সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা এবং দুই নেতার এসব সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয় দফায়, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলের ক্ষেত্রেিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিষদ, ৩০ বিলিয়ন ডলারের পারস্পরিক শুল্ক সুবিধার কাঠামো এবং কুয়ালাল কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান যেন টোল আরোপ না করে, সে বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে।
চতুর্থ দফায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মিত্রতার ইতিহাস স্মরণ করা হয়েছে।
পঞ্চম দফায়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিষদ, ৩০ বিলিয়ন ডলারের পারস্পরিক শুল্ক সুবিধার কাঠামো এবং কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত আগের বাণিজ্য আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো বহাল রাখার বিষয় রয়েছে।
ষষ্ঠ দফায়, মাদক ও মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান পাচার বন্ধে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এআই-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি চ্যানেল তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা দুই দেশের সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে। চীনের দাবি, সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানে দুই দেশে কয়েক ডজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে।
সপ্তম দফায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এআই-সংক্রান্ত কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত যোগাযোগের জন্য একটি চ্যানেল তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা নভেম্বরে হওয়ার কথা।
অষ্টম দফায়, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা চিড়িয়াখানায় পাঠানো দুটি জায়ান্ট পান্ডাকে স্বাগত জানানোর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংকটের সময়ে যোগাযোগ আরও কার্যকর করতে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক করার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিযোগিতা থাকলেও আলোচনার পথ খোলা
বৈঠককে ট্রাম্প ‘বন্ধুত্ব, শক্তি ও সাফল্যের’ বৈঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ‘নতুন অধ্যায়ের’ সূচনা করেছে।
তবে শুল্ক, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। আট দফা সমঝোতা থেকে আপাতত যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো— বাণিজ্য ও কৌশলগত বিরোধ চলমান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক সামাল দেওয়ার পথ খোলা রাখছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ