বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে যমুনা সেতুর পরিবর্তে পদ্মা সেতু-বেনাপোল হয়ে চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আসন্ন দুর্গাপূজার ছুটির আগেই নতুন রুটে ট্রেনটি চালুর বিষয়ে ঢাকা ও দিল্লি চেষ্টা করছে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গত ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩৮তম বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেলওয়ে মিটিংয়ে (আইজিআরএম) মৈত্রী এক্সপ্রেসের নতুন রুটের প্রস্তাব দেয় ভারতীয় পক্ষ। বৈঠকে বাংলাদেশ জানায়, ভারত কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিলে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, পদ্মা সেতু-বেনাপোল রুটে ট্রেন চালু হলে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় প্রায় তিন ঘণ্টা কমে ছয় ঘণ্টায় দাঁড়াবে। একই সঙ্গে টিকেটের ভাড়া প্রায় এক হাজার টাকা কমতে পারে। যাত্রীসেবার মানোন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই নতুন রুটের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত পুরোনো রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেসে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ যাত্রী ভ্রমণ করেন। তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। ট্রেনটির গড় আসন পূর্ণতার হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ এবং ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটিতে তা ৯৫ শতাংশের বেশি হতো।
নিরাপত্তাজনিত কারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আন্তঃসীমান্ত যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার স্মারক চুক্তি অনুযায়ী, মৈত্রী এক্সপ্রেসের টিকেট বিক্রির মোট আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ২৫ শতাংশ ভারতীয় রেলওয়ে।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু দিয়ে এর আগে কোনো আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলেনি। ফলে নতুন রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর আগে কারিগরি ও পরিচালনাগত সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। ভারতের প্রস্তাবটি নতুন হওয়ায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও এখনও শেষ হয়নি।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতার প্রভাব রেল যোগাযোগসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও পড়েছে। তবে উভয়পক্ষই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
এর ধারাবাহিকতায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (এক) হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
বৈঠক শেষে হুমায়ুন কবির বলেন, আলোচনা ভালো হয়েছে এবং নিকট ভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী। সম্পর্কের চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলেও জানান তিনি।
একই দিন ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে। তবে এর জন্য যথাযথ সময় দিতে হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মৈত্রী এক্সপ্রেসের নতুন রুটে চলাচল শুরুর বিষয়টি এখন কারিগরি যাচাইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। নতুন রুটে ট্রেন চালু হলে যাত্রীদের সময় ও খরচ দুটোই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বহুমাত্রিক। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ট্রানজিট, চিকিৎসা, শিক্ষা, পর্যটন, চোরাচালান ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ জড়িত। এসব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে