ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের মামলায় কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা হামিদ রাসায়িকে ১০ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির বিশেষ ধর্মীয় আদালত।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কারাদণ্ড পাওয়া রাসায়ি ইরানের প্রথম সংসদ সদস্য। তার এই কারাদণ্ডকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থী মহলে গালিবাফ এবং প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইর বিরুদ্ধে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
রাসায়ি ২০২৩ সালে তেহরান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে যোগ দেওয়ার আগে তিনি কট্টরপন্থী সাপ্তাহিক ‘৯ দে’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পত্রিকাটিতে ‘গালিবাফের পার্লামেন্টারি নথি কারসাজি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে গালিবাফের বিরুদ্ধে সংসদীয় নথি নিয়ে কারসাজির অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের শুরুতেই গালিবাফ অভিযোগ করেন। তখনো রাসায়ি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেননি। ধর্মীয় নেতা হওয়ায় মামলাটি বিশেষ ধর্মীয় আদালতে বিচার করা হয়। আদালত তাকে অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য প্রকাশের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে।
রক্ষণশীল শিবিরে মতবিরোধ
রাসায়ির কারাদণ্ড এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা ও ইরানের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে দেশটির রক্ষণশীল শিবিরে মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইরান স্টাডিজ বিষয়ক আইআরএএম সেন্টারের গবেষক রহিম ফারজামের মতে, পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে আলোচনাপন্থী ও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছে।
তবে ফারজাম মনে করেন, মতবিরোধ থাকলেও সেটিকে সরাসরি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন হিসেবে দেখার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তার মতে, ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তারা একই রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।
রাসায়ির সমর্থনে কট্টরপন্থীদের ক্ষোভ
কারাদণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কট্টরপন্থী রাজনীতিক ও গণমাধ্যমের একটি অংশ গালিবাফ ও বিচার বিভাগের সমালোচনা শুরু করে। সাবেক পরমাণু আলোচক সাঈদ জলিলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন রাজনীতিকও রাসায়ির পক্ষে অবস্থান নেন।
কোমের আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-মানান রাইসি গালিবাফকে সতর্ক করে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে রাজা নিউজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেইসাম নিলি বিচার বিভাগকে অবিচার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের জন্য অভিযুক্ত করেন।
কট্টরপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, তিন বছর আগের একটি সংবাদ প্রতিবেদনের অভিযোগ প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখার সুযোগ কেন নেওয়া হয়নি।
রাসায়ির কারাদণ্ড নিয়ে ক্ষোভ কয়েকটি সরকারপন্থী সমাবেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাবনাকের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কিছু বিক্ষোভকারীকে রাসায়ির সমর্থনে এবং গালিবাফের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা যায়। তবে তাবনাক তাদের একটি ছোট গোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেছে, তারা সমাবেশগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে।
ইরানের নেতৃত্ব কি সত্যিই বিভক্ত?
গবেষক রহিম ফারজামের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মতবিরোধ রয়েছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে মূল প্রশ্ন হলো, এসব মতবিরোধ দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার অবস্থানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করার মতো কাঠামোগত বিভাজনে রূপ নিয়েছে কি না।
তার মতে, বিষয়টিকে শুধু ‘আলোচনার পক্ষে’ বনাম ‘আলোচনার বিপক্ষে’—এমন সরল দুই ভাগে দেখা ঠিক হবে না। বরং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে বিভিন্ন আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির মধ্যে চলমান সমন্বয় ও দর-কষাকষির অংশ হিসেবেই বিষয়টি দেখা উচিত।
ফারজাম আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্বকে একই সঙ্গে কৌশলগত নমনীয়তা বজায় রাখা, আত্মসমর্পণের ধারণা এড়িয়ে চলা, প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখা, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব আদর্শিক সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখার মতো একাধিক চাপ সামলাতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, এই প্রক্রিয়া অনেক সময় অগোছালো ও বিতর্কপূর্ণ মনে হলেও সেটিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
রাসায়িকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর এভিন কারাগারের ধর্মীয় বন্দিদের জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে ১০ মাসের সাজা ভোগ করতে হবে। তার কারাদণ্ডকে ঘিরে ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য এখন আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ