২০২২ সালের শেষের দিকে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেটে গেছে দীর্ঘ সাত বছর, তবুও আশার আলো দেখেনি সাভারের আশুলিয়ার বংশী নদীর ওপর নির্মিত ‘নলাম সেতু’। একটি সেতু বদলে দিতে পারত কয়েক লাখ মানুষের জীবন, কমিয়ে দিত বছরের পর বছর ধরে চলা যাতায়াতের চরম দুর্ভোগ। তবে উদাসীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সেই স্বপ্ন আজ অধরাই রয়ে গেছে।
নির্মাণাধীন এই নলাম সেতু এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়নের প্রতীক নয়; বরং অবহেলা, ধীরগতি ও দীর্ঘসূত্রতার এক নির্মম উদাহরণ। এর ফলে বংশী নদীর দুই তীরের অন্তত ১০ গ্রামের লাখো মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেয়ানৌকায় পারাপার হতে বাধ্য হচ্ছেন।
সরজমিনে দেখা যায়, সাভার উপজেলার আশুলিয়া থানার বংশী নদীর তীরে অবস্থিত মাইঝাল, পাইছাল, উনাইল, ধামসোনা, গোপালবাড়ীসহ অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক লাখ মানুষের মূল চলাচল এই নদীর ওপর দিয়েই। এলাকাবাসীর কাছে নলাম সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি ছিল উন্নত যোগাযোগ, নিরাপদ যাতায়াত এবং অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়।
বর্তমানে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা একটি খেয়া নৌকা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে নদী পার হতে হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কোনো অসুস্থ রোগী কিংবা প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়। অনেক ক্ষেত্রে একেকটি নৌকার অপেক্ষাই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির মুখে ২০১৯ সালের ২১ জুলাই ৮২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের নলাম সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। সেতুটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ২০২২ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এরপরও সেতুর নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণই থেকে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে কাজ প্রায় বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীর মনে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের প্রতিবাদে সম্প্রতি নলাম সেতুর সামনে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তাদের একটাই দাবি—অবিলম্বে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে ১০ গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে হবে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দফতরের কার্যকর তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণেই বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পটি ঝুলে আছে।
এলাকার বাসিন্দা ও ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি মোহাম্মদ তমিজ উদ্দিন বলেন, দীর্ঘ সাত বছর আগে নলাম সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও তা শেষ হয়নি। একটি সেতুর অভাবে ১০ গ্রামের কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে জরুরি রোগী—সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেয়ানৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করে শেষ করা না হলে ১০ গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
কৃষক মোহম্মদ আলী বলেন, নদীর ওপারে আমার বেশ কয়েক বিঘা জমি রয়েছে। প্রতিদিনই নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে যেতে হয়। বর্ষাকালে একটু উনিশ-বিশ হলেই নৌকা থাকে না, তাই গামছা বা হাফপ্যান্ট পরে সাঁতরে নদী পার হতে হয়। অসুস্থ রোগী নিয়ে যাতায়াতে ভোগান্তির শেষ নেই। তাছাড়া উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহমিদা সুলতানা বলে, নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন ভয় নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সেতুটি নির্মাণ হলে আমাদের অনেক উপকার হতো। বিশেষ করে পানির ভয়ে অনেক ছোট শিশু স্কুলেই যেতে চায় না।
দর্জি দোকানদার আহমেদ হোসেন বলেন, প্রতিদিনই আমাকে এই নদী পার হয়ে কাজে যেতে হয়। রাত আটটার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তখন জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যাওয়া যায় না। প্রায়ই নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনাও ঘটে।
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কহিনুর অ্যান্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ (জেভি)-এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে সাভার উপজেলা এলজিইডির কর্মকর্তা মিনারুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও কার্যাদেশ বাতিলের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেতুর অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুর ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/জোই