দেশে আমদানি বাড়ছে, একই সময়ে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ বেড়ে ৭৫ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। এর বিপরীতে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে। এক বছর আগে একই সময়ে রিজার্ভ ছিল ৩০ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি ডিপার্টমেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খোলার পরিমাণও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলসি খোলা বেড়েছে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে পণ্য আমদানির কার্যক্রম আগের বছরের তুলনায় বাড়তির দিকেই রয়েছে।
সাধারণত আমদানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ে। এতে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু এবার আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি রিজার্ভও বাড়ছে। এর মধ্যে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ।
তবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেক বড় উৎস রফতানিতে চিত্রটি বিপরীত। জুলাইয়ে রফতানি আয় ১ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এ সময়ে তৈরি পোশাক রফতানিও ১ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমেছে। মোট রফতানি আয়ের ৮২ দশমিক ২৩ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে।
রফতানি কমা এবং আমদানি বাড়ার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ভারসাম্যে। জুলাইয়ে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত কমে ৬ কোটি ডলারে নেমেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১২ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার কারণেই চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত কমেছে।
এরপরও রিজার্ভে স্বস্তি রয়েছে। ১৫ আগস্ট ২০২৬-এ রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের ১৫ আগস্টের তুলনায় এটি ৬ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার বেশি। অর্থাৎ এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।
তবে রিজার্ভ বাড়ার মধ্যেও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমেছে। ১ থেকে ১৫ আগস্ট সময়ে আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার ছিল ১২৩ টাকা ৫৭ পয়সা। এ সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকা ১ দশমিক ৬০ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, বৈদেশিক খাতের এই প্রবণতার সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহের চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এক বছর আগে একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
অন্যদিকে সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। জুন শেষে সরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। রাজস্ব আদায় কম হওয়া এবং সরকারি ব্যয় বাড়ার কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে, যা জুনে ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও সামান্য কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে এখন পরস্পরবিরোধী কয়েকটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমদানি ও রেমিট্যান্স বাড়ছে, ফলে রিজার্ভও শক্তিশালী হচ্ছে।
আবার রফতানি কমছে এবং বাণিজ্য ঘাটতির কারণে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত সংকুচিত হচ্ছে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলেও সরকারি ব্যাংক ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধির স্বস্তির পাশাপাশি আমদানি-রফতানির ভারসাম্য এবং অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ— দুদিকেই নজর রাখার প্রয়োজন থাকছে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও