যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর হাসপাতালে জ্ঞান ফিরেছে দণ্ডিত খুনি ক্রিস্টা পাইকের। জ্ঞান ফেরার পর তিনি ‘রাগান্বিত ও বিভ্রান্ত’ অবস্থায় ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী র্যান্ডি স্পাইভি।
গত সপ্তাহে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পরও বেঁচে যান ৫০ বছর বয়সী পাইক। চিকিৎসক ও তার আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা নজিরবিহীন। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর এর আগে কোনো বন্দি এভাবে বেঁচে ফিরেছেন, এমন নজির নেই।
জ্ঞান ফেরার পর প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘আমি কোথায়?’
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী স্পাইভি জানান, জ্ঞান ফেরার পর পাইকের প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘আমি কোথায়?’ এরপর তিনি জানতে চান, ‘আপনি কে?’
স্পাইভির ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে পাইকের আইনজীবীরা মনে করেছিলেন তিনি হয়তো মস্তিষ্ক-মৃত অবস্থায় রয়েছেন এবং যেকোনো সময় লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু মঙ্গলবার হঠাৎ তিনি কথা বলতে শুরু করেন।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনার খুব অল্প কিছু বিষয়ই তিনি মনে করতে পারছেন।
আইনজীবী জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় পাইক নিজেই কর্মকর্তাদের তার হাতে শিরা খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন। ওই সময় তিনি শান্ত ও ভদ্র আচরণ করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
এরপর জ্ঞান ফেরার সময় তিনি নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পান। তার গলায় একটি টিউব ছিল এবং আশপাশে থাকা লোকজনকে তিনি চিনতে পারছিলেন না। বর্তমানে তার দুই হাতই প্রচণ্ড ফুলে গেছে।
শারীরিক অবস্থাও গুরুতর
আইনজীবী স্পাইভি বলেন, পুরো ঘটনার মানসিক প্রভাব পাইকের ওপর কতটা পড়বে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তিনি জানান, জ্ঞান ফেরার পর পাইক রাগান্বিত ও বিভ্রান্ত ছিলেন।
এ ছাড়া তার একটি হাতে রক্ত জমাট বেঁধেছে। তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এবং এখনো নিজে থেকে খাবার বা পানি গিলতে পারছেন না।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর টেনেসিতে পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। তাকে পরপর দুই দফা পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও তার মৃত্যু না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে কয়েক দিন অচেতন থাকার পর চিকিৎসকেরা তার শরীর থেকে ইনজেকশনের ওষুধের প্রভাব দূর করার চিকিৎসা চালান।
প্রমাণ সংরক্ষণের নির্দেশ আদালতের
ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখতে বুধবার জরুরি শুনানি হয়। পাইকের আইনজীবীরা আদালতের কাছে ওই দিনের সব ধরনের প্রমাণ সংরক্ষণের আবেদন করেন।
আদালত তাদের আবেদন মঞ্জুর করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কক্ষে থাকা সবকিছু সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে ব্যবহৃত আইভি লাইন, সিরিঞ্জ, ওষুধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিনিসপত্র, প্যাকেট, লেবেল এবং অন্যান্য বর্জ্যও রয়েছে।
এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে, চলাকালীন এবং পরে পাইকের মানসিক অবস্থার বিষয়ে থাকা সব নথিও সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারক আইশিয়া মাইলস অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য যেন ভুল করে হারিয়ে না যায় বা মুছে না ফেলা হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
পাইকের আইনজীবী লুক ইনেন বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর দীর্ঘ সময় তাদের মক্কেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি অচেতন ছিলেন এবং কথা বলতে পারছিলেন না। এখন সীমিতভাবে কথা বলতে পারলেও তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, অনিশ্চিত
আদালতের শুনানিতে রাজ্যের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল উইল আয়্যার্স বলেন, ঘটনাটি একটি ‘অস্বাভাবিক পরিস্থিতি’। বিচারকও পরিস্থিতিটিকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড নতুন করে কবে কার্যকর করা হবে কি না— বিচারকের এমন প্রশ্নের জবাবে আয়্যার্স বলেন, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।
এদিকে টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময় অঙ্গরাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর সাময়িক বিরতি দিয়েছেন। ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় কী ভুল হয়েছিল, তার উত্তরও তিনি চান। এ ঘটনার পর অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধান পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পাইকের আইনজীবীরা তাকে একটি ফোন ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ারও আবেদন করেছেন, যাতে তিনি সরাসরি তার আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। একই সঙ্গে হাসপাতাল থেকে তাকে অন্য কোনো কারাগার বা সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আইনজীবীদের জানানোর দাবিও করা হয়েছে।
আইনজীবীদের অভিযোগ, হাসপাতালের বিছানায় পাইকের হাত-পা শিকল বা হাতকড়ায় বাঁধা রাখা হয়েছে, যদিও চিকিৎসাকর্মীরা তা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
১৯৯৫ সালের হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ড
ক্রিস্টা পাইক ১৮ বছর বয়সে ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন। ১৯৯৫ সালে পাইক তার তৎকালীন প্রেমিক টাডারিল শিপের সঙ্গে মিলে স্লেমারকে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করেন।
তিনজনের পরিচয় হয়েছিল সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে।
অপরাধের সময় শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। সে সময় তিনি আইনগতভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। বর্তমানে তিনি কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।
অন্যদিকে, পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বরের ব্যর্থ প্রাণঘাতী ইনজেকশনের পর তার মৃত্যুদণ্ডের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ