রাজবাড়ীতে নিখোঁজের তিন দিন পর ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া কলেজছাত্র চৌধুরী ফুয়াদ হাসান রোহান (১৯) হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, গামছা, কালো টি-শার্ট ও নিহতের স্যান্ডেল উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত জনতা আসামিদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুর ১টার দিকে রাজবাড়ী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন।
এর আগে একই দিন ভোর ৪টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়ন ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়ে থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যরা তিনজনকে গ্রেফতার করেন।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বক্তারপুর এলাকার দুলাল সরদারের ছেলে ফিরোজ সরদার বাবু (৩৪), গণি সরদারের ছেলে রিয়াজ সরদার (২৩) এবং একই ইউনিয়নের সমেসপুর এলাকার সিদ্দিক মণ্ডলের ছেলে মো. শরীফ (২৭)।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, গত ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির ফোন পেয়ে বাড়ি থেকে বের হন রোহান। এরপর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। পরদিন ৬ অক্টোবর তাঁর পরিবার রাজবাড়ী সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।
পরে ৮ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে দাদশী ইউনিয়নের পাকুড়িকান্দা গ্রামের দিলীপ সেনের একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় রোহানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর পেট কাটা ছিল। এ ঘটনায় ৯ অক্টোবর রোহানের বাবা ফরহাদ চৌধুরী বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, রোহানের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর থেকেই সদর থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে মীর মনির হোসেন জানান, জমিজমা নিয়ে পূর্বশত্রুতা ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রোহানকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে গামছা ও টি-শার্ট দিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করা হয়। মরদেহ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য ধারালো ছুরি দিয়ে পেট কেটে বস্তাবন্দি করা হয়। পরে বস্তার সঙ্গে বালুভর্তি আরেকটি বস্তা বেঁধে মরদেহটি পরিত্যক্ত ডোবায় ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিদের দেখানো মতে, ফিরোজ সরদার বাবুর শয়নকক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও গামছা এবং রিয়াজ সরদারের শয়নকক্ষ থেকে শ্বাসরোধে ব্যবহৃত কালো টি-শার্ট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া দাদশী ইউনিয়নের বক্তারপুর এলাকায় বিনয় কুমার দাসের পুকুরের কচুরিপানার মধ্য থেকে রোহানের পরিহিত স্যান্ডেল উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত জব্দ করেছে পুলিশ।
গ্রেফতার তিনজনের ভূমিকা সম্পর্কে পুলিশ সুপার বলেন, ফিরোজ সরদার বাবু ও রিয়াজ সরদার হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন। শরীফ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁরা ভাড়াটে হিসেবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তাঁদের অর্থের জোগানদাতা বা হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী কে, তা তদন্তের স্বার্থে এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না। গ্রেফতার তিনজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল হক, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নিহত রোহানের বাবা ফরহাদ চৌধুরী বলেন, গ্রেফতার ব্যক্তিরা চুক্তির বিনিময়ে তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছেন।
এদিকে শনিবার দুপুর ২টার দিকে উত্তেজিত জনতা আসামিদের বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে যান। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিহত রোহানের স্বজনদের পুকুর থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে উত্তেজিত লোকজন তাঁদের বাধা দেন। এ সময় নারী-পুরুষেরা রোহান হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
সময়ের আলো/এনএন