আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ময়মনসিংহের জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপ সাজানো হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সাজে। দম ফেলার ফুরসত নেই সাজসজ্জা, তোরণ ও মঞ্চ তৈরির শ্রমিকসহ পূজারিদের। অভিমান আর বুকে চাপা কষ্ট নিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে আনন্দের জোয়ার, ঢাকের আওয়াজ আর আলোঝলমলে মণ্ডপের আলোকচ্ছটা। ময়মনসিংহে দেবী দুর্গার আগমনি বার্তায় চারদিকে যখন উৎসবের সাজ সাজ রব, তখন মণ্ডপের সেই মূল প্রাণ— প্রতিমা গড়ে তোলা মৃৎশিল্পীদের ঘরে নেমেছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দাম এবং প্রতিমা তৈরির কাঁচামালের দরবৃদ্ধির এই যুগে প্রতিমা বানিয়ে জীবন চালানো তো দূরের কথা, খরচের টাকাই উঠছে না তাদের। পেট চালানোর আশা ছেড়ে দিয়ে অনেক প্রবীণ কারিগর এখন শুধু বাপ-দাদার স্মৃতি রক্ষা আর শখের বশে টিকিয়ে রেখেছেন এই ঐতিহ্যবাহী মৃৎ শিল্প।
মৃৎ শিল্পী শম্ভু দাস বলেন, পূজার সময় চলে এসেছে, কাজ এখনো অনেক বাকী। প্রতিমা তৈরির কারিগর এখন আর আগের মতো পাওয়া যায় না। কম টাকায় কারিগররা কাজ করতে চায় না। তারা এখন আগের দামে কাজ করতে চায় না। পার্টি যারা প্রতিমা কিনে নেবে তারাও ঠিকমতো দাম দেয় না। আজ থেকে পাঁচ ছয় বছর আগে প্রতিমার দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এখন আগের দামেই প্রতিমা নিতে চায়। আমাদের আসলে কিছুই করার নাই, এখন শুধু প্রতিমা তৈরি করি শখের বসে। শুধু শখের জন্য কম টাকায় প্রতিমা তৈরি করি। আর এখন জিনিসপত্রের যে দাম বেড়েছে তাতে আমাদের চলে না। জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ বাড়লেও প্রতিমার দাম আর বাড়ে না। আগের সাথে তুলনা করলে এখন এই টাকা কিছুই না। মৃৎ শিল্পীদের কথা কেউ ভাবে না।
তিনি আক্ষেপ আরও বলেন, সব কিছুর দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে মূর্তি গড়ার পেছনের খরচই ওঠে না, লাভ তো দূরের কথা। আগে এই কাজ করে সংসার চলত, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করাতাম। আর এখন কারিগরদের বেতন দিতেই হিমশিম খেতে হয়। জীবিকার কথা ভাবলে অনেক আগেই এই কাজ ছেড়ে দিতাম। কেবল রক্তের টানে, দেবীর প্রতি ভক্তি আর শখের বশে এখনও মণ্ডপে মণ্ডপে মা দুর্গাকে রূপ দিয়ে যাচ্ছি।
মৃৎ শিল্পী পল্টু দাস বলেন, প্রতিমা তৈরির প্রতিটি উপাদানের দাম বিগত কয়েক বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। যে মাটির ট্রলি আগে কম দামে পাওয়া যেত, তা এখন চড়া দামে কিনতে হচ্ছে। এছাড়া বাঁশ, খড়, সুতলি, পেরেক, পাটের চুল, বিভিন্ন রঙের কেমিক্যাল এবং দেবীর শাড়ি ও অলংকার— সবকিছুর দামই এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু সেই তুলনায় পুজো কমিটি বা পার্টিদের কাছ থেকে মিলছে না প্রতিমার সঠিক মূল্য। সবশেষে আমাদের লাভের তুলনায় ক্ষতিই হয় বেশি।
তিনি আরও বলে, মাসের পর মাস ঘাম ঝরিয়ে প্রতিমা তৈরি করে হস্তান্তরের পরও বহু পুজো কমিটি সময়মতো টাকা মেটায় না। অগ্রিম বা বায়নার সামান্য কিছু টাকা দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার পর বাকি পাওনা পরিশোধে চলে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক সময় বাজেটের অজুহাত দেখিয়ে বকেয়া টাকা আটকে রাখা হয়, আবার কখনো কখনো সেই টাকা আর পুরোপুরি মিলেই না।
মৃৎ শিল্পী জয়ন্ত পাল বলেন, এ বছর আমি ১৫টি প্রতিমা তৈরি করছি। গত বছর ২২টি প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। এ বছর প্রতিমার অর্ডার আছে কিন্তু কারিগর সংকট, জিনিসের দাম অনেক বেশি। পার্টিরা প্রতিমার দাম আগের মতই দিতে চায়। কারিগর সংকটের কারণে এ বছর প্রতিমা কম তৈরি করছি। আসলে এই কাজই যেহেতু শিখেছি তাই শখের জন্যই প্রতিমা তৈরি করে যাচ্ছি। আর মৃৎ শিল্পীদের এ অবস্থা থাকলে সময়ের সাথে সাথে এটাও হারিয়ে যাবে।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি সম্পর্কে জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শংকর সাহা জানান, দুর্গাপূজাকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন পূজা উদ্যাপন কমিটির প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আশ্বাস পাওয়া গেছে। তাই গত বছরের তুলনায় এবার আরও উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পূজা উদ্যাপনের প্রত্যাশা করছেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পূজামণ্ডপগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি পূজা মণ্ডপের নেতৃবৃন্দের সভা করে সরকারি যে নির্দেশনাগুলো আছে তা দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য থাকবে। কেউ যেন আতঙ্কিত না হয়, সুষ্ঠু ও শান্তি পূরণ এবং উৎসব মুখর পরিবেশে দুর্গা পূজা পালন করতে পারে সে লক্ষ্যে জেলা পুলিশ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
এবার নগরী ও জেলা সদরে ৯০ টিসহ জেলায় ৮০৬ টি পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। উৎসবের আলো যেন কেবল মণ্ডপের আলোকসজ্জা আর জাঁকজমকেই সীমাবদ্ধ না থাকে। যাদের হাতের স্পর্শে দেবী রূপ পায়, সেই মৃৎশিল্পীদের পেটে ক্ষুধা রেখে কখনো প্রকৃত আনন্দ হতে পারে না। পুজো কমিটিগুলোর সঠিক মূল্যায়ন, সময়মতো পাওনা মিটিয়ে দেওয়া এবং এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে হয়ত অচিরেই হারিয়ে যাবে শতাব্দীর প্রাচীন এই প্রতিমা গড়ার শিল্প।
সময়ের আলো/আতা