রাজনীতির জটিলতা ভাঙতে চাই বাস্তব পদক্ষেপ

শায়রুল কবির খান

মতামত

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২ বছরের অধিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বিএনপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো কতটা নিবিড়ভাবে

2026-10-12T06:07:38+00:00
2026-10-12T06:07:38+00:00
 
  সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬,
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
মতামত
রাজনীতির জটিলতা ভাঙতে চাই বাস্তব পদক্ষেপ
শায়রুল কবির খান
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৭ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২ বছরের অধিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বিএনপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামীর রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। বিএনপি সরকারের জামায়াতে ইসলামীকে কি আওয়ামী কৌশলে মোকাবিলা করা উচিত, নাকি ভিন্নভাবে করা উচিত।

বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক চিন্তাধারার কতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে, এগুলোই প্রধান এবং একমাত্র শক্তি। এর বিপরীতে বিকল্প রাজনৈতিক চর্চা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, তবে অতীতের মতো নানাভাবে চেষ্টা হতে পারে।
রাজনীতির ময়দানে সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রশ্নে বিএনপির মতো শক্ত ভিত্তি আর কোন রাজনৈতিক দলের আছে? যার প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫০-এর অধিক সদস্য নিয়ে গঠিত কমিটির নেতৃত্ব আছে? জনগণের মাঝে তা দৃশ্যমান আছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক রাজনীতির প্রধান জায়গাটা হলো বিএনপি। তাদের রাজনৈতিক দর্শন আছে, অর্থাৎ ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এর বিপরীতে আওয়ামী লীগের তার চেয়ে শক্তিশালী কোনো রাজনৈতিক দর্শন নেই। 

আওয়ামী লীগ এসেছে মুসলিম লীগ থেকে, যে লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান সৃষ্টি। মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, বাকশাল ও পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ— এই জায়গাগুলো তারা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করেছে; কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের যে জাতিসত্তা প্রয়োজন, তা তারা দিতে পারেনি এবং দেওয়ার চেষ্টাও করেনি। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে বর্তমানে বা আগামী সময়ে তা দেওয়ার সুযোগ আছে বলেও মনে হয় না।

বিএনপির তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক ভিত্তি, রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও মুক্তিযুদ্ধ— অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। এর বিপরীতে রয়েছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে সাংগঠনিক নেতৃত্ব, অর্থাৎ একাত্তর ইস্যু। তা হলে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, বিএনপির রয়েছে তিনটি শক্তি আর তার বিপরীতে আওয়ামী লীগের দুটি।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে গত ২ বছরের অধিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি বিএনপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে, তার ওপর নির্ভর করবে আগামীর রাজনীতির
গতিপ্রকৃতি। বিএনপি সরকারের জামায়াতে ইসলামীকে কি আওয়ামী কৌশলে মোকাবিলা করা উচিত, নাকি ভিন্নভাবে করা উচিত?

জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যখন যার সঙ্গে যেভাবে চলা দরকার, সেভাবে মিশে গিয়ে চলতে পারে। তারা একাত্তর ইস্যুতে কোনো উপলব্ধির মধ্য দিয়ে তাদের গঠনতন্ত্রে বা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যে যে পরিবর্তন আনবে না, তা আরও স্পষ্ট হয়েছে তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিখুঁত পর্যালোচনায় ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিকথায় লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী : ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স’ বইয়ে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সবার হলেও কৌশলে তার রাজনৈতিক ফায়দাটা নিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে উদার গণতান্ত্রিক এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রধান নেতৃত্ব বিএনপির কাছেই রয়ে গেছে।

বর্তমান বাস্তবতা : আওয়ামী লীগের মতো একটি চরম অপরাধপন্থি সংগঠনকে মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পাওয়ার মতো দুর্ভাগ্য বিএনপিকে আজন্ম বয়ে বেড়াতে হয়েছে। আরও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আওয়ামী গোষ্ঠীর লজ্জাজনক পলায়নে বিএনপি যে একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে সে উপায়ও নেই। বর্তমান বাস্তবতায় বিশেষ করে বিগত ১৭ বছর অপরাধপন্থি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি যদি এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি ধাঁচেরই আরেকটি রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় ভূমিকায় পেত, তবে তা দেশের চলমান প্রেক্ষাপটে সবার জন্যই কল্যাণকর হতো। কিন্তু এটা অনেকটা কাল্পনিক মনে হতে পারে।

যাই হোক, এই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি জামায়াতে ইসলামী ও সাম্প্রতিক (বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর) নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিকে পেল। সময়টা খুব বেশি না, আবার খুব কমও না। এই দুই বছরে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিরোধিতা করার কাজটি বিএনপি কতটা পারদর্শিতার সঙ্গে করেছে তা যদি এখনই সঠিকভাবে অনুধাবন করা না যায়, তবে বড় দেরি হয়ে যাবে।

অবিশ্বাস্য হলেও লক্ষণীয়, জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলার কৌশল হিসেবে বিএনপির প্রধান ইস্যু এখনও মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে জামায়াতে ইসলামীর দুর্বল জায়গা সেখানে— এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সত্তা, আমাদের চেতনা; সে জন্যই কেবল এই মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া কি জামায়াতের আর কোনো দুর্বল জায়গা নেই? জামায়াত কি সত্যি এতটা সবল? জামায়াতের রাজনীতি কি এতটাই নির্ভুল ও নিষ্পাপ যে, মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া জামায়াতকে মোকাবিলা করার আর বিকল্প কোনো ইস্যু নেই?

উত্তর হচ্ছে— আছে, অবশ্যই আছে। সর্বদা সুবিধাবাদী ও ভ্রান্ত রাজনৈতিক অবস্থান, মিথ্যাচারিতা, গুজব ছড়ানোর কাঁচা কৌশল এবং মুনাফেকি হলো জামায়াতের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। চাঁদাবাজি ও দখলবাজিতেও পিছিয়ে নেই তারা। বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক আকারের অনুপাতে জামায়াতের অবস্থান যৌক্তিকভাবে বিচার করলে বিএনপির শতাধিক অপকর্মের সমান জামায়াতের একটি অপকর্ম।

জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশে একাত্তরের দুর্বলতা কাঁধে নিয়ে রাজনীতি করে গেছে এবং করছে। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতার স্বাদ পেতেও জামায়াতের সামনে একাত্তর বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। পরবর্তীতে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে অবৈধ ক্ষমতা ধরে রাখার আওয়ামী কৌশলে জামায়াতকে কঠিন বেকায়দায় পড়তে হলেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে তারা আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছে। এতে করে দলটি ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক চাবিকাঠি হাতে পেয়ে যায়। শেখ হাসিনার অপরিণামদর্শী কৌশলের কারণে জামায়াতের চারাগাছ বড় বৃক্ষে পরিণত হতে চাইছে, তারা আর আগের মতো বোতলবন্দি হয়ে থাকতে রাজি নয়।

এবার জামায়াতে ইসলামীর নতুন সঙ্গী এনসিপি, বহু বৈশিষ্ট্যের এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম এবং নব্য জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান রঞ্জন— তারা সম্মিলিত চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং অপেক্ষা করছেন বিএনপির একটি বড় ভুলের। আওয়ামী কলঙ্কের শিকার মহান মুক্তিযুদ্ধের জৌলুস বিএনপিকেই ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রকৃত সত্যের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধকে মহিমান্বিত করতে হবে বিএনপিকে। 

আওয়ামী মিথ্যাচার ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যবসার পসরা সামান্যতম রেখে, মানুষকে বোঝানো যাবে না যে বিএনপির উদ্দেশ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সত্যকে গ্লোরিফাই করা। স্বাধীনতার ঘোষক ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রক্ত ও নীতির উত্তরাধিকার হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সব অপরাজনীতি মোকাবিলা করে ‘৩১-দফা’র ভিত্তিতে আগামীর কল্যাণময় বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবেন।

লেখক : সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
মতামত লেখকের নিজস্ব
  বিষয়:   রাজনীতি  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: