পটুয়াখালীর সঙ্গে পিরোজপুর, খুলনা ও মোংলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে পটুয়াখালীর পায়রা নদীর ওপর নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু। কথা ছিল ২০২৩ সালের মধ্যেই শেষ হবে নির্মাণকাজ। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুর মূল কাজই শুরু হয়নি। সেতু নির্মাণ না হওয়ায় দুপাড়ের মানুষকে রোজ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এদিকে, নকশা জটিলতা ও অর্থসংকট নিয়ে ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দিয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।
২০২০ সালে একনেকে অনুমোদনের পর শুরু হয় নির্মাণকাজ। সেতুটির সংশোধিত নির্মান ব্যায় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২০ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৬ শতাংশ। মাঠপর্যায়ে রয়েছে ১০ দশমিক ৪ একর অধিগ্রহণ করা জমি, তিনতলা টোল, অফিস ভবন এবং নির্মাণ ইয়ার্ড। এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে ছয়টি টেস্ট পাইল, ৬০টি সার্ভিস পাইল, ছয়টি পাইল ক্যাপ ও তিনটি পিয়ার কলাম। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে থেমে যায় সেতুর মূল নির্মাণকাজ।
এরপর পেরিয়ে গেছে দেড় বছরেরও বেশি সময়। নির্মাণস্থলে পড়ে আছে মরিচাধরা যন্ত্রপাতি, অর্ধনির্মিত অবকাঠামো। নকশা জটিলতা, ঠিকাদারের অর্থসংকট নাকি পরামর্শকের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা- কেন থেমে গেল এত বড় প্রকল্প? দায়ইবা কার? এ নিয়ে রয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। আইএমইডির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক জটিলতার কথা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারের জমা দেওয়া কিছু নকশা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ছিল না। আবার ঠিকাদার ও পরামর্শকের মধ্যে সমন্বয় ও সমঝোতার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে মূল্যায়নে।
২০২৩ সালের সংশোধিত চুক্তিতে সড়কের বাঁক মসৃণ করা, সেতুর স্প্যানের দৈর্ঘ্য বাড়ানো এবং টোল মনিটরিং সুবিধায় পরিবর্তন আনা হয়। নতুন এসব শর্ত পূরণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তৈরি করতে হয় নতুন নকশা। এতে চলে যায় আরও প্রায় ১৮ মাস। নকশা চূড়ান্ত না হওয়ায় বর্তমানে বন্ধ রয়েছে সেতুর নির্মাণকাজ।
সেতু না থাকায় নৌযানে রোজ পারাপার হতে হচ্ছে দুপাড়ের মানুষকে। ছবি : সময়ের আলো
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মীর আখতার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড বিল্ডার্সের প্রজেক্ট ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার ফারহান খান চৌধুরী বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের পঞ্চম বৃহত্তম সেতু। এই সেতুর ডিজাইনটাও আমরাই করছি। আমাদের প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যে ডিজাইন ড্রয়িং কমপ্লিট করেছে। ডিজাইনের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে বাকি কাজ সম্পন্ন করব। ইতোমধ্যে ভায়াডাক্টের পাইল শেষ করা হয়েছে, কিছু অংশে পাইল ও পাইল ক্যাপের কাজ করা হয়েছে। বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলে বাকি কাজ শুরু করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিটি সেক্টরই অর্থনৈতিক দিক থেকে একটু খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের যে অর্থনৈতিক সমস্যা সেটি সাময়িক। দ্রুত আমরা এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসব। এছাড়া সাব কন্ট্রাকটরসহ বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে আমাদের যে ব্যবসা, তা চলমান প্রক্রিয়া। কারও সঙ্গে দেনা-পাওনা কিন্তু একসঙ্গে মেটানো হয় না, তাদের কাজের বিনিময়ে আমরা কিছু পেমেন্ট দেই, আবার তারা কাজ করে, এভাবেই চলছে।’
সেতু নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘সরকারের ফান্ডের কোনো ঘাটতি নেই, ঠিকাদারের ফান্ডে ঘাটতি রয়েছে। তারা আমাদের কাছে কিছু বিষয় নিয়ে ক্লেইম করেছে। সেগুলো সেটেলমেন্ট না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজ করবে না বলেছে; যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কাজ বন্ধ রাখার কোনো সুযোগ চুক্তিতে নেই। তারা কাজ করবে, ক্লেইম সেটেলমেন্টের জন্য বোর্ড গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। বোর্ডের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু শর্ত লঙ্ঘন করে ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখেছেন। চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিজাইনের যে সকল বিষয়ে দ্বিমত ছিল, তা একমত হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। ইতোমধ্যে মূল সেতুর সাব-স্ট্রাকচার ও ভায়াডাক্টের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদি কেউ বলে ডিজাইনের সমস্যার জন্য কাজ করা যাচ্ছে না, সেটি সঠিক নয়। ঠিকাদার লো প্রাইসে কাজ নেওয়ার জন্য তাদের লস হবে, সেজন্য তারা কাজ বন্ধ রেখেছে। তারা যদি শিগগিরই কাজ শুরু না করে, সমস্যা সমাধানে অচিরেই বর্তমান ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করবে কর্তৃপক্ষ। তবে, এতে প্রকল্পের সময় ও ব্যয়-দুটিই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
কৃষক মজিবর মৃধা বলেন, ‘সেতু না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নদীর দুপাড়ের মানুষের। কৃষিপণ্য পরিবহনে বাড়ছে সময় ও খরচ। জরুরি প্রয়োজনে নদী পার হতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। ট্রলারে জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা। স্পিডবোটে লাগে ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। রাত কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় বাড়ে ঝুঁকি, সঙ্গে বাড়ে পারাপারের খরচও।’
১ হাজার ৪২ কোটি টাকার প্রকল্প। অথচ প্রতিশ্রুত সেতুর বদলে নদীর দুপাড়ে এখনো চলছে নৌযানে পারাপার। একদিকে অর্ধনির্মিত অবকাঠামো, অন্যদিকে পড়ে আছে নির্মাণযন্ত্র। নকশা জটিলতা, অর্থসংকট ও সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে, এসবের বাইরে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একটাই- কবে শেষ হবে তাদের অপেক্ষা? কবে পায়রা নদীর ওপর দাঁড়াবে প্রতিশ্রুত সেই সেতু?