আজ প্রায় ৯ মাস। ছোট ছেলে নাবিল আশুলিয়ার নিরিবিলি স্বপ্ন বিলাস থেকে সেই যে ৫০ টাকা নিয়ে গেল। এখন পর্যন্ত ফিরে এলো না। ছেলের শোকে শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। একসময় ভর্তি হলেন উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। আর সেই হাসপাতালেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আর তিনি হলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম দিকের অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম নাসিমা খান।
নাসিমা খান যখন চলচ্চিত্রে আসেন তখন ঢাকার নায়িকা ছিলেন সুলতানা জামান, রওশনআরা, সুমিতা দেবী, চিত্রা সিনহা। এরপরে আসেন শবনম। নায়ক আনিস যিনি চলচ্চিত্রের পরিচালক, সংগীত পরিচালক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, তার হাত ধরেই চলচ্চিত্র জগতে আগমন এই অভিনেত্রীর। পরবর্তীতে খান আতাউর রহমানের উৎসাহে নাসিমা খান চলচ্চিত্র জগতে নিয়মিতভাবে কাজ শুরু করেন।
ঢাকার দ্বিতীয় সবাক ছবি ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ তে নাসিমা খানের প্রথম অভিনয়। তবে তিনি সে সময় নায়িকা চরিত্রে অভিনয় না করলেও এক ছবিতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নায়িকা হিসেবে তার প্রথম ছবি ‘যে নদী মরু পথে’। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৫৯ সালে উর্দু ছবি ‘তানহা’ ছিল তার অভিনয় জীবনের বাকবদলের পরিক্রমা। এই তানহা ছবিতে তার সঙ্গে অভিনয় করেন শবনম ও সুমিতা দেবী। সূর্যস্নান ছবি থেকে তার অভিনয়ের মাত্রা বাড়তে থাকে। এরপর ধারাপাত, কার বউ, উজালা, বেগানা, আপন দুলাল, উলঝন, ম্যায় ভি ইনসান হু, দুই ভাই, গৌরি, আমার বউ, ঢেউয়ের পর ঢেউ, নাচঘর, শাদী, শীত বিকেল, পরওয়ানা, রংবদলায়, পায়ে চলার পথ, উত্তরণ, মেঘের পর মেঘ, মোঘল ই আজম, দুই দুয়ারি, সুন্দরী বধূ, কুসুম কুসুম প্রেমসহ আরও অনেক ছবি।
এ জে কারদারের পরিচালিত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। নাসিমা খানের ছবির বেশিরভাগ নায়ক ছিলেন আনোয়ার হোসেন, হারুন, হাসান ইমাম, মুস্তফা, আজিম। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উর্দু ছবি উজালা মুক্তি পেয়েছিল হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা হলে। বলাকা সিনেমায় ছবিটি নিজেই দেখতে এসেছিলেন ছবির নায়িকা নাসিমা খান। ছবি শেষ হলে চারদিকে নাসিমা খান হলে আসার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিড়ের কারণে তিনি সহজে হল থেকে বের হতে পারছিলেন না। তাকে খুব কষ্টে ছবির নায়ক হাসান ইমাম পেছনের দরজা দিয়ে বের করে এনেছিলেন।
ধারাপাত ছবিতে ইসমতআরা বেগমের একটি গান বেশ বিখ্যাত হয়েছিল। আর সেই গানের কলি ছিল, ‘এত কাছে চাঁদ বুঝি কখনো আসেনি’। সেই গানের ঠোঁট মিলিয়েছিলেন নায়িকা নাসিমা খান। পরে নাসিমা খানের সঙ্গে কণ্ঠশিল্পী ইসমতআরা বেগমের এক ধরনের মিতালি হয়ে গিয়েছিল।
এক সাক্ষাৎকারে নাসিমা খান নিজেই বলেছিলেন, অনেক নায়কদের সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম মুস্তফার সঙ্গে অভিনয় করার সময় বেশ কিছুটা ইতঃস্ততবোধ করতাম। তিনি মুস্তফাকে একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে মনে করতেন।
চিত্রা সিনহা হাতে গোনা কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তার অভিনিত ‘ভাইয়া’ ছবি দেখে খুব প্রশংসা করেছিলেন নাসিমা খান। চিত্রা সিনহা অবশ্য পরিচালক কাজী জহিরকে বিয়ে করার পর অভিনয় জগৎ থেকে আস্তে আস্তে সরে যান। এই সরে যাওয়া নিয়ে নাসিমা খান প্রায় সময় আক্ষেপ করে বলতেন, এই ধরনের নায়িকা বাংলাদেশে খুব কম আসে। যে কারণে তিনি নিজে কাজী জহিরকে বলেছিলেন, চিত্রাকে অভিনয় জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়েন না।
নাসিমা খান চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি টেলিভিশনে অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক নাটকে তার অভিনয় দর্শকদের বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শেষ বয়সের দিকে তিনি বেশিরভাগ মা কিংবা ভাবির চরিত্রে অভিনয় করতেন। তবে যখনই যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন তখনই সেই চরিত্রের সঙ্গে যেন মিশে যেতেন। তিনি প্রায় সময় বলতেন, অভিনয় হচ্ছে এক ধরনের মানুষের যাপিত জীবনের বিভিন্ন চরিত্রের নকল করা।
নাসিমা খানের জন্ম পুরান ঢাকার লালবাগে। কিন্তু তার আদি বাড়ি বিক্রমপুর। যে কারণে নাটকের কিংবা চলচ্চিত্র সেটে তিনি প্রায় সময় ঢাকার আদি ভাষায় কথা বলতেন। অনেকে এ নিয়ে হাসাহাসি করত।
দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের এই অভিনেত্রীর প্রয়াণে শ্রদ্ধা দৈনিক সময়ের আলোর পক্ষ থেকে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা