প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তাল রংপুর

সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো

সারাদেশ

রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব ঘিরে রংপুরে ক্ষোভ বাড়ছে। বিভাগীয় শহরের

2026-10-13T19:41:06+00:00
2026-10-13T19:41:06+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে উত্তাল রংপুর
সাইফুল ইসলাম, রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৪১ পিএম 
আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ছবি : সময়ের আলো
রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাব ঘিরে রংপুরে ক্ষোভ বাড়ছে। বিভাগীয় শহরের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প অন্য জেলায় নেওয়ার উদ্যোগের খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়নের দাবিতে সরব হয়েছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারাও। দাবি আদায়ে আন্দোলন গড়ে ওঠার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এ বিষয়ে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে দৈনিক সময়ের আলোকে রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান জানিয়েছেন, প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ বা স্থানান্তরসংক্রান্ত কোনো চিঠি কিংবা কাগজপত্র এখন পর্যন্ত তাঁর কাছে আসেনি। বিষয়টি নিয়ে যতটুকু আলোচনা হচ্ছে, তা মূলত ফেসবুকনির্ভর।

জেলা প্রশাসকের এ বক্তব্যের পর প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, বিকল্প জমি অনুসন্ধান এবং স্থানান্তরের প্রস্তাবের প্রশাসনিক অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

যেভাবে সামনে এলো স্থানান্তরের প্রস্তাব

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জোসেফা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে রংপুর বিভাগের জন্য অনুমোদিত কেন্দ্রটি লালমনিরহাটে স্থাপনের প্রস্তাবের বিষয়টি উঠে এসেছে। চিঠিটি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্যের (সিনিয়র সচিব) কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) কেন্দ্রটি রংপুর সদর উপজেলার মন্থনা মৌজায় নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এজন্য বিভিন্ন খতিয়ানে ১০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত জমি তিন ফসলি হওয়ায় জমির মালিকেরা লিখিত আপত্তি জানান। এতে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়।

এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু লালমনিরহাটে কেন্দ্রটি স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দেন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ি ইউনিয়নের বৈরাগিকুমুর ও নওদাবস মৌজায় ১০ একর জমি প্রস্তাব করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, স্থান পরিবর্তন করা হলে ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রীর ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে জরুরি ভিত্তিতে পূর্বানুমতি চাওয়া হয়েছে এবং ডিপিপি সংশোধনের সময় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

তবে রংপুর সদর উপজেলার প্রস্তাবিত জমিতে জটিলতা দেখা দেওয়ার পর একই এলাকায় বিকল্প জমি খোঁজা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে চিঠিতে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। এ কারণে বিভাগীয় শহরের পরিবর্তে অন্য জেলায় কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রংপুরেই কেন্দ্র চান বিএনপি নেতারা

রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী ডন বলেন, বিভাগীয় নামে অনুমোদিত একটি প্রকল্প অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা থাকলে তা সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা নেওয়া যেত।

তিনি বলেন, এই চিঠি প্রকাশের আগে আমরা জানতামই না যে সরকার এজন্য জমি অধিগ্রহণ করছে এবং সেখানে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জমি অধিগ্রহণে সমস্যা থাকলে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা যেত। রংপুরে সরকারি এ ধরনের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া সম্ভব। আমরা চাই, প্রকল্পটি রংপুরেই বাস্তবায়ন করা হোক।

রংপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামও প্রকল্পটি রংপুরে রাখার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, সব দিক বিবেচনা করেই রংপুরে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি জানান, রংপুরেই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। অন্য কোনো জেলার প্রয়োজন থাকলে সেখানে পৃথক প্রকল্প নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সুষম সেবা নিশ্চিতের প্রশ্ন

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের রংপুর মহানগর কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, এ ধরনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুরো বিভাগের মানুষের যাতায়াত, ভৌগোলিক অবস্থান ও সেবা পাওয়ার সুযোগ বিবেচনা করা জরুরি।

তিনি বলেন, রংপুর থেকে পঞ্চগড়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও লালমনিরহাটের মোগলহাটের দূরত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে বিভাগীয় পর্যায়ে সেবা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলে বিভাগের সব জেলার মানুষ সমান সুবিধা নাও পেতে পারেন।

খন্দকার ফখরুল আনাম আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বণ্টনে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। মন্ত্রীদের নিজ নিজ এলাকার স্বার্থের পাশাপাশি বৃহত্তর জনস্বার্থ ও সুষম উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

জমি নিয়ে জটিলতার কথা জানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাসুদ হোসেন জানান, প্রকল্প অনুমোদনের পর জমি অধিগ্রহণের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়ে জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করা হয়েছিল। এরপর গণবিজ্ঞপ্তি জারিসহ অধিগ্রহণের পরবর্তী কার্যক্রম জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

তিনি বলেন, পরে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি নিয়ে কিছু জটিলতার কথা জানানো হয়। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানানো হয়েছিল।

মাসুদ হোসেন বলেন, অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁরা জানতে পেরেছেন, প্রকল্পটি লালমনিরহাটে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রকল্প পরিচালক সম্প্রতি লালমনিরহাটে গিয়ে প্রস্তাবিত জমি পরিদর্শন করেছেন। তবে প্রকল্পটি রংপুরে বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা কাজ করছেন।

সাত বিভাগে ২০০ শয্যার কেন্দ্র

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ব্যবস্থাপনায় সারাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত। তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় আঞ্চলিক পর্যায়ে সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষের জন্য এ ধরনের বিশেষায়িত সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে নতুন কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর বিভাগের মানুষের চিকিৎসাসেবা, যাতায়াতের সুবিধা ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে প্রকল্পটির অবস্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রে। একদিকে জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, অন্যদিকে স্থানান্তরের প্রস্তাব—দুই বিষয়েই স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চায় স্থানীয় জনমত।

রংপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা কাগজপত্র পৌঁছায়নি। ফলে প্রকল্প স্থানান্তরের প্রস্তাবটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন, জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

সদর ৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করে এ বিষয়ে কোন মতামত পাওয়া যায়নি।

সময়ের আলো/এনএন

  বিষয়:   মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র  জমি অধিগ্রহণ  রংপুর  লালমনিরহাট  প্রকল্প  আন্দোলন  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: