টাঙ্গাইল সদর উপজেলার আকুর টাকুর মৌজায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধিগ্রহণকৃত জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জমির মালিকানা ও বণ্টন সংক্রান্ত বিরোধের জেরে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী বাদী হয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে টাঙ্গাইলের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে ৭২ নম্বর বাটোয়ারা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় বিবাদী পক্ষ আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভবন নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া, পৌরসভার ইমারত নির্মাণ সংক্রান্ত বিধিবিধান লঙ্ঘন করে এবং জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে পৌরসভার সাবেক প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্ত, নির্বাহী কর্মকর্তা আনিসুর রহমান, নগর পরিকল্পনাবিদ শহীদুল ইসলাম এবং নকশাকার ইলিয়াসের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জমির সরকারি স্বার্থ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মো. সাইফুল ইসলাম খানসহ কয়েকজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১ এপ্রিল বিল্ডিং কন্সট্রাকশন কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সুপারিশের প্রেক্ষিতে শর্তসাপেক্ষে ছয় তলা বিশিষ্ট ভবনের নকশার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে অনুমোদন নেওয়ার আগেই চার তলা সম্পূর্ণ করলেও পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। শুধু তাই নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত জমি পরিমাপ করে অর্থের বিনিময়ে পৌরসভার নিজস্ব রাস্তা দেখিয়ে এবং চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভবন নির্মাণে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ২৭ এপ্রিল ভবনের নকশার অনুমোদন দেয় পৌর কর্তৃপক্ষ।
পাউবো সূত্রে আরও জানা যায়, জমি রক্ষা ও প্রতিকার চেয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর বিভিন্ন সময়ে লিখিত
অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পৌর কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলার আকুর টাকুর মৌজায় সিএস ৩৭২ নম্বর দাগে ৫৩ শতাংশ, ৩৭৪ নম্বর দাগে ১৯ শতাংশ, ৩৭৫ নম্বর দাগে ২৯ শতাংশ এবং ৩৭৭ নম্বর দাগে ৩ শতাংশসহ মোট ১০৪ শতাংশ জমি এলএ কেস নম্বর ৫৫/৫৭-৫৮-এর মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরবর্তীতে ওই জমিতে টাঙ্গাইল জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় নির্মাণ করা হয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিগ্রহণ করা ১০৪ শতাংশ জমির মধ্যে বিএস/বিআরএস ৩১১৬ ও ৩১১৪ নম্বর দাগে ৭৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ জমি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। অধিগ্রহণ করা জমির তুলনায় কম জমি রেকর্ডভুক্ত হওয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, টাঙ্গাইল বাদী হয়ে টাঙ্গাইলের যুগ্ম জেলা জজ প্রথম আদালতে ২০২৫ সালে ৭২ নম্বর বাটোয়ারা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়ের পশ্চিম পাশে অবস্থিত বিরোধপূর্ণ জমিতে ৩১ থেকে ১৩৬ নম্বর বিবাদী প্রতিপক্ষ বহুতল ভবন নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, বিরোধপূর্ণ জমিতে সরকারি ভূমি দখল ঠেকাতে বাদীপক্ষ আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ৩১ থেকে ১৩৬ নম্বর বিবাদী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। তবে আদালতের ওই আদেশ থাকা সত্ত্বেও বিরোধপূর্ণ জমিতে বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ অব্যাহত রেখেছে ভবন মালিকরা। এ অবস্থায় আদালতের আদেশ অমান্য করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়া এবং সরকারি জমি দখলের চেষ্টা বন্ধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সরকারি জমির মালিকানা, আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং ভবনের নকশা অনুমোদন সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ভবন মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করছি। আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, আমরা সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।
টাঙ্গাইল পৌরসভার সার্ভেয়ার (জমি পরিমাপকারী) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, নকশায় যে ১২ ফুট রাস্তা দেখানো হয়েছে। আসলে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণকৃত জমি। নতুন এবং পুরাতন নকশায় সেখানে পৌরসভার কোনো নিজস্ব রাস্তা নেই। তবে কিছুদিন আগে একটি দেয়াল ভেঙে একটি রাস্তা বের করেছে ভবন মালিকরা।
টাঙ্গাইল পৌরসভার নকশাকার ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, আমি আমার স্যারদের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছি। আপনারা যা পারেন সেটা করেন।
মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ভবনের নকশা অনুমোদনের বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মামলার বিষয়টি আমাদের হয়ত জানা ছিল না। সে সময় পৌরসভার প্রশাসক সঞ্জয় কুমার মহন্ত আমাকে নকশা অনুমোদন দিতে বলেছিলেন। আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছি।
এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, আমরা মামলা করেছি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আজ না কাল তাদের ভবন ভেঙে ফেলে আমাদের জমি ফেরত দিতে হবে।
সময়ের আলো/এনএন