ঋণের চাপ সামাল দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা, কর অব্যাহতি হ্রাস, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
অপরদিকে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির কাছ থেকে বাড়তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে এখন আরও সহযোগিতা পাওয়া উচিত। বুধবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার তৃতীয় দিনে সংস্থাটির ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক সংবাদ ব্রিফিংয়ে রাজস্বনীতি, ভর্তুকি সংস্কার ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়গুলো উঠে আসে। একই দিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য আরও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাশার কথা জানান। পৃথক বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়ার কথা জানান।
ঋণের বদলে বিনিয়োগে জোর বাংলাদেশের
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশের জন্য আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছে সরকার।
তিনি বলেন, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী সহায়তা পাওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়েছে। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত।
সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বিনিয়োগ ও যৌথ বিনিয়োগের দিকে বেশি যেতে চায় বাংলাদেশ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গেও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
দুই থেকে তিন মাসে সহযোগিতার নিশ্চয়তার আশা
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহযোগিতা করবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ।
তিনি বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একমত হয়েছে যে বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে।
উপদেষ্টা আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মনে করছে, বর্তমান সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ কারণে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এসব সহযোগিতার বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ঢালাও ভর্তুকি কমিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা
আইএমএফের ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ক ব্রিফিংয়ে সরকারি ব্যয় সংকোচন, বাজেট ঘাটতি কমানো এবং ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন সংস্থাটির ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস, উপ-পরিচালক এরা দাবলা-নরিস এবং বিভাগের ডিভিশন চিফ ডেভিডে ফুরচেরি।
রদ্রিগো ভালদেস সদস্য দেশগুলোকে সরকারি ব্যয় সংকোচন ও বাজেট ঘাটতি কমাতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। আইএমএফের মতে, ঋণের চাপ সামাল দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ঢালাও ভর্তুকি সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে এর সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের কাছে বেশি পৌঁছায়। এ কারণে জ্বালানি বা অন্যান্য খাতে সবার জন্য সমান ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কার্যকর হতে পারে।
তবে ভর্তুকি কমানোর ফলে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেন আরও বেড়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই ভর্তুকি সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ
রাজস্ব আয় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ, অযৌক্তিক কর অব্যাহতি প্রত্যাহার এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কর আদায়ব্যবস্থা সহজ ও কার্যকর করা গেলে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতাদের ব্যয় এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে মিসরের ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার ও কর অব্যাহতি কমানোর উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও ভ্যাট অব্যাহতি প্রত্যাহার, জ্বালানি কর ব্যবস্থার স্বাভাবিকীকরণ এবং ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কলম্বিয়াকে রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, কর প্রশাসনের উন্নয়নের মাধ্যমে কিছু দেশে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কর সংস্কারের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
ঋণের সুদ পরিশোধে বাড়ছে চাপ
বৈশ্বিক সরকারি ঋণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজস্বনীতির সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে আইএমএফ। উচ্চ সুদের কারণে উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর বাজেটে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। ফলে উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবার মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং বয়স্ক জনসংখ্যার কারণে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় আগাম আর্থিক প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।
ঋণ সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণ পুনর্গঠন, পরিশোধের সময় বাড়ানো এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংস্থাটি। তবে ঋণ পরিশোধের চাপ সামলানোর পাশাপাশি উন্নয়ন ব্যয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করাই এসব দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে