অভিনেত্রী নূতন। ছবি : সংগৃহীতবাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত এবং নায়ক সোহেল রানা (পারভেজ মিডিয়া) প্রযোজিত এই কালজয়ী সিনেমাটি কেবল সেলুলয়েডের ফিতায় বাঁধানো কোনো গল্প নয়, এটি আমাদের রক্তাক্ত ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
সময়ের পরিক্রমায় সেই ছবির অনেক তারকা— নায়করাজ রাজ্জাক, শাবানা, হাসান ইমাম, এটিএম শামসুজ্জামান থেকে শুরু করে গুণী নির্দেশক চাষী নজরুল ইসলাম অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে সিনেমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র শিলার ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেত্রী নূতনের স্মৃতিতে আজও সেই দিনগুলো অমলিন, যেন গতকালের ঘটনা। এই সিনেমায় কাজের অভিজ্ঞতা ও পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
সুমিতা দেবীর আড্ডা ও ‘শিলা’ হয়ে ওঠার শুরু
ওরা ১১ জন ছিল আমার অভিনয় জীবনের মাত্র দ্বিতীয় সিনেমা। কিন্তু আজ পেছন ফিরে তাকালে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে— এমন একটি মহাকাব্যিক সৃষ্টির অংশ হতে পেরেছিলাম! এখনও যেখানেই যাই, মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে এই সিনেমাটির কথা স্মরণ করেন। এটি শুরুর আগের গল্পটা দারুণ ছিল। বিখ্যাত অভিনেত্রী সুমিতা দেবীর বাসায় এক দিন আমরা আড্ডায় বসেছিলাম। সেখানে সোহেল রানা ভাই, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ভাইসহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। কথা বলতে বলতেই শিলা চরিত্রের জন্য আমাকে চূড়ান্ত করা হয়। চিত্রনাট্য শোনার পর চরিত্রটি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
বিএফডিসির ২ নম্বর ফ্লোর ও বাস্তবের বীরাঙ্গনা
সিনেমাটির শুটিং হয়েছিল সাভারের খোলা প্রান্তর এবং বিএফডিসির বিভিন্ন ফ্লোরে। কিন্তু সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ঘটেছিল বিএফডিসির ২ নম্বর ফ্লোরে, সিনেমার শেষ দৃশ্য ধারণের সময়। পটভূমিতে বেজে উঠেছিল কালজয়ী গান— ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ...’। সেই গানটির সঙ্গে আমরা যারা বীরাঙ্গনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম, তারা একে একে বের হয়ে আসি। চারপাশের পরিবেশটা তখন এতটাই করুণ আর ভারী হয়ে উঠেছিল যে, অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে অভিনয়শিল্পী মনে হয়নি, মনে হয়েছিল আমি সত্যিই একজন বীরাঙ্গনা! কারণ ১৯৭১ সালের যুদ্ধ আমি নিজের চোখে দেখেছি, যুদ্ধের দিনগুলোতে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেরিয়েছি। তাই ওরা ১১ জন আমার কাছে কখনো শুধুই কোনো সিনেমা মনে হয়নি, মনে হয়েছিল এটি আমারই দেখা বাস্তব জীবনের করুণ ইতিহাস।
আরেকটি অভাবনীয় বিষয় ছিল, খসরু ভাইসহ কয়েকজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা এই সিনেমায় সরাসরি অভিনয় করেছিলেন। যারা কয়েক দিন আগেও রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, তাদের সঙ্গে ক্যামেরা ভাগাভাগি করাটা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
অশ্রুসজল বিনম্র শ্রদ্ধা
আজ পেছন ফিরে তাকালে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সিনেমার সেই স্বজনদের অনেকের মুখই আজ স্মৃতির পাতায় চলে গেছে। বিশেষ করে পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এবং আমাদের প্রিয় রাজ্জাকের কথা বারবার মনে পড়ে।
এত বড় সাহসিকতা নিয়ে একটি সত্য গল্পকে রুপালি পর্দায় বন্দি করার জন্য সোহেল রানা ও চাষী ভাইয়ের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
ওরা ১১ জন কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি চিরকালের জন্য থেকে যাওয়া এক ইতিহাস। তরুণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একটাই বার্তা থাকবে— দেশকে ভালোবাসো, রক্তের দামে কেনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানো এবং বেশি বেশি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা দেখো।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে