ছবি : সংগৃহীতবাংলা চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ও বর্ণিল পরিক্রমায় এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাদের জীবন ও সৃষ্টি কেবল বিনোদনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তারা হয়ে ওঠেন একটি জাতির চেতনার ধারক ও বাহক। সেলুলয়েডের ফিতায় মাটি, মানুষ, স্বাধিকার আন্দোলন এবং ইতিহাসের নির্মম সত্যকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলে বাংলা চলচ্চিত্রকে যারা বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম অগ্রপথিক হলেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে যিনি ইতিহাসকে জীবন্ত করেছেন এবং সিনেমার পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন বাঙালির আত্মত্যাগের মহাকাব্য, সেই মহান শিল্পীর জীবন ও কর্ম বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে চির অম্লান।
শেকড়সন্ধানী শৈশব ও সংগ্রামী জীবনের সূচনা
১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) শ্রীনগর উপজেলার সমষপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া চাষী নজরুল ইসলামের রক্তে ও মননে ছিল দেশপ্রেমের দীক্ষা। তার পরিবারে ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন এক আবহ। শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে বাঙালির মুক্তির প্রতিটি টার্নিং পয়েন্ট। পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্থিরতার মধ্যেই তিনি যুক্ত হন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে। মঞ্চনাটক এবং নাট্যনির্মাণের মাধ্যমে তার শৈল্পিক জীবনের হাতেখড়ি হলেও চলচ্চিত্রের প্রতি তার তীব্র আকর্ষণ তাকে নিয়ে আসে সেলুলয়েডের জাদুকরি ভুবনে।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ফতেহ লোহানীর সহকারী হিসেবে চলচ্চিত্রে তার পথচলা শুরু হয়। এ ছাড়া ওবায়েদ উল হক এবং মুস্তফা মেহমুদের মতো গুণী নির্মাতাদের সান্নিধ্য তার শিল্পীসত্তাকে শানিত করেছিল। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুবাদেই তিনি চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ ও সূক্ষ্ম কারিগরি দিকগুলো আত্মস্থ করেন, যা পরবর্তী সময়ে তার নিজস্ব নির্মাণশৈলীতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল।
সেলুলয়েডে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কাব্য : ‘ওরা ১১ জন’
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না, এটি ছিল একটি পরাধীন জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করার পাশাপাশি চাষী নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করতেন ক্যামেরাও হতে পারে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার ঠিক পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি নির্মাণ করেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’।
এটি শুধু একটি সিনেমা ছিল না; এটি ছিল একাত্তরের জীবন্ত দলিল। যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা মাত্র কয়েক দিন আগেও রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে গর্জে তুলেছিলেন, সেই আসল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পর্দায় অভিনয় করিয়ে তিনি এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন। খসরু, মুরাদ, হেলালসহ বাস্তব জীবনের মুক্তিসেনাদের রুপালি পর্দায় নিজেদের চরিত্রের পুনরাভিনয় ফুটিয়ে তুলতে বাধ্য করা ছিল এক দুঃসাহসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ছবির প্রতিটি ফ্রেমে মিশে ছিল সহযোদ্ধা হারানোর বেদনা, বিজয়ের আনন্দ এবং মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। ওরা ১১ জন সিনেমাটি মুক্তির পর কেবল বাণিজ্যিকভাবে সফলই হয়নি, এটি বাঙালির জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এই একটিমাত্র চলচ্চিত্র চাষী নজরুল ইসলামকে বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমরত্ব দান করে।
পরিচালনা শৈলী, নান্দনিকতা, মানবীয় গুণাবলি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস
একজন পরিচালক হিসেবে চাষী নজরুল ইসলাম ছিলেন অত্যন্ত সূক্ষ্মদর্শী ও নিখুঁত। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দৃশ্যের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বা আলো ফেলার কায়দাও দর্শকের মনে গভীর রেখাপাত করতে পারে। তার চলচ্চিত্রে শিল্পীদের অভিনয়ের ওপর সবসময় বাড়তি জোর থাকত।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি চলচ্চিত্র শিল্পের অধিকার রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শিল্প ও শিল্পীর প্রতি তার এই নিরঙ্কুশ ভালোবাসা তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ আসনে সমাসীন করেছিল। তার প্রতিটি কাজে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতি গভীর বিশ্বাস, আস্থা ও শ্রদ্ধা প্রতিফলিত হয়েছে সবসময়।
রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও চিরবিদায়
বাংলা চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চাষী নজরুল ইসলাম বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এ ছাড়া একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তার মুকুটে যুক্ত হয়েছে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে গেছেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০১৪ সালের ১১ জানুয়ারি এই ক্ষণজন্মা নির্মাতা না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তার প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় তার এক অভিভাবক ও প্রাণপুরুষকে।
চাষী নজরুল ইসলাম কেবল একটি নাম নন; তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের একটি স্বর্ণালি অধ্যায়। রুপালি পর্দার এই জাদুকর শারীরিকভাবে আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি করা সেলুলয়েডের অমর কাব্যদৃশ্যগুলো বাংলা সংস্কৃতি ও বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল দীপ্তিময় হয়ে বেঁচে থাকবে।
পরিচালিত যত সিনেমা
চাষী নজরুল ইসলাম ১৯৬১ সালে ‘আছিয়া’ সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন চলচ্চিত্র অঙ্গনে। এরপর দুই দিগন্ত (১৯৬৪) নামের আরেকটি সিনেমারও সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম ঐতিহাসিক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর দেশের প্রথম সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে পূর্ণ পরিচালক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন।
পরিচালক হিসেবে তার পরিচালিত অন্যান্য সিনেমাগুলো হচ্ছে— সংগ্রাম (১৯৭৪), বাজিমাত (১৯৭৮), ভালো মানুষ (১৯৮১), দেবদাস (১৯৮২), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), লেডি স্মাগলার (১৯৮৬), মিয়া ভাই (১৯৮৭), বেহুলা লখিন্দর (১৯৮৭), বিরহ ব্যথা (১৯৮৮), মহাযুদ্ধ (১৯৮৮), বাসনা (১৯৮৯), দাঙ্গা ফাসাদ (১৯৯০), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), দেশ জাতি জিয়া (১৯৯৩), আজকের প্রতিবাদ (১৯৯৫), শিল্পী (১৯৯৫), হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৯৭), হাছন রাজা (২০০১), কামালপুরের যুদ্ধ (২০০২), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), শাস্তি (২০০৪), সুভা (২০০৬), ধ্রুবতারা (২০০৬), দুই পুরুষ (২০১১), দেবদাস (২০১৩) (দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম রঙিন সংস্করণ), অন্তরঙ্গ (২০১৫) (মৃত্যুর পর মুক্তিপ্রাপ্ত), ভুল যদি হয় (২০১৬) (মৃত্যুর পর মুক্তিপ্রাপ্ত)।
সময়ের আলো/এসএকে