লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মিমাংসা বিরোধ। ছবি : সময়ের আলোআদালতের বাইরে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতিতে মামলা ও বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৬ হাজার ৪৩৯টি মামলা নিষ্পত্তি করে এ ক্ষেত্রে দেশের সব জেলার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ সময়ে বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে প্রায় পৌনে ১২ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে। আইনি পরামর্শ পেয়েছেন ৮ হাজার ৭২৬ জন।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেনমোহর, বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য কলহ, যৌতুক, চেক ডিজঅনার, আর্থিক পাওনা এবং জমিজমা নিয়ে বিরোধের মতো নানা বিষয়ে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধান দেওয়া হচ্ছে। উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। এতে মামলা পরিচালনার খরচ, সময় ও ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে। গত এক বছরে এ ধরনের ৭০৪টি মামলায় বিনা মূল্যে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় পারিবারিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার সমাধান হয়েছে। এমনই একটি ঘটনায় দুই সন্তান থাকা অবস্থায় স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেন। পরে এক মাসের মধ্যে দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তাদের আবার স্বাভাবিক সংসার জীবনে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এ ছাড়া পাঁচ সৎ ভাইবোনের মধ্যে জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মাত্র এক দিনের একটি বৈঠকেই মীমাংসা হয়। মৌখিক প্রতিশ্রুতিতে জমি কেনাবেচার লেনদেন সম্পন্ন হলেও জমির মালিক নিবন্ধন করে না দেওয়ায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় দুই মাসের মধ্যে তারও সমাধান হয়।
বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামীর পরিবারের কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা দেনমোহর না পাওয়ার অভিযোগেরও নিষ্পত্তি হয়েছে মধ্যস্থতার মাধ্যমে। এ ছাড়া চেক ডিজঅনার, পাওনা টাকা আদায়, জমির সুষ্ঠু বণ্টন এবং দখলসংক্রান্ত বিরোধ সমাধানের নজির রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তা করেছেন।
ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে সেবার পরিধি বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে মোট ৭০২টি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০০। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট বিরোধ নিষ্পত্তির সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫৭৯টিতে।
সফল বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির তথ্য জানিয়েছে অফিসটি। ২০২৩ সালে ১৪৩টি এবং ২০২৪ সালে ১৪২টি বিরোধ সফলভাবে মীমাংসা হয়েছিল। চলতি বছরে আগস্ট পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৯টিতে।
আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে ১ হাজার ১৮৯ জন এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ২৩৮ জন এ সেবা নেন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আইনি পরামর্শ নিয়েছেন ৭ হাজার ১৩৮ জন। একই সময়ে উপকারভোগীর সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় বেড়ে ৯ হাজার ৭০৯ জনে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালে উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল ৩৬২ এবং ২০২৪ সালে ৫৫৭ জন।
বিরোধ মীমাংসার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিমাণেও বড় পরিবর্তনের তথ্য দিয়েছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। ২০২৩ সালে মীমাংসার মাধ্যমে ২ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা আদায় হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ পরিমাণ ছিল ৯১ লাখ ৫২ হাজার টাকা। চলতি বছরে আগস্ট পর্যন্ত আদায়ের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অফিসের দেওয়া তুলনামূলক হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে সফল বিরোধ মীমাংসা বেড়েছে ১ হাজার ৪৮৪ শতাংশ। মোট বিরোধ নিষ্পত্তি বেড়েছে ৬৩১ শতাংশ, আইনি পরামর্শ গ্রহণকারীর সংখ্যা ৪৭৭ শতাংশ এবং উপকারভোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৬৪৩ শতাংশ। একই সময়ে মীমাংসার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে ১ হাজার ৪২৫ শতাংশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৩৯টি মামলা নিষ্পত্তি করে দেশের সব জেলার মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ময়মনসিংহ। এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কুমিল্লা এবং তৃতীয় স্থানে নোয়াখালী।
এ সময়ে প্রায় পৌনে ১২ কোটি টাকা আদায়ের পাশাপাশি ৮ হাজার ৭২৬ জনকে আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মোট উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২৫২ জনে।
ময়মনসিংহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, গত এক বছরে তার কার্যালয়ের মধ্যস্থতায় বিপুলসংখ্যক বিরোধের সফল নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে মামলার পক্ষগুলোকে পাওনা টাকা আদায়ে সহায়তা করা হয়েছে এবং শত কোটি টাকা মূল্যের জমিজমা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি শতাধিক সংসার বিচ্ছেদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নারী ও পুরুষকে বিনা মূল্যে আইনি পরামর্শ দেওয়ার ফলে সেবাগ্রহীতা ও উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিরোধের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সহজ করাই তাদের কার্যক্রমের লক্ষ্য।
সময়ের আলো/জোই