ভারতের রাজধানী দিল্লিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ও ক্ষমতাসীন বিজেপি। ছবি : এনডিটিভি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে দিল্লির রামলীলা ময়দানে সমাবেশ করেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। একই দিনে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহতদের স্মরণে পাল্টা মিছিল করেছে বিজেপি। দুই দলের কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীতে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত বিরোধীদের সমাবেশে অংশ নিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এম এ বেবি ও তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। ১ নভেম্বর আয়োজিত এ কর্মসূচিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিরোধী জোটের এ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘চলো দিল্লি’। বিকেল ৪টায় সমাবেশে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি অনুযায়ী বিকেল ৫টায় সমাবেশ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে কোনো চমক থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সমাবেশ ঘিরে কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড ও হরিয়ানা থেকে দলীয় কর্মীদের নিয়ে এসেছে। সমাজবাদী পার্টি ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতারাও নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে যোগ দিয়েছেন। তবে সমাবেশে বামপন্থী দলগুলোর কর্মীদের উপস্থিতি বেশি বলে জানা গেছে।
এর আগে, গতকাল শনিবার বিরোধীদের একটি কর্মসূচিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ছয় দফা অভিযোগসংবলিত একটি প্রতীকী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এতে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের ষড়যন্ত্র, ১৩ কোটি ২০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, সংসদের তদারকি ছাড়াই ফরম-৬ পরিবর্তন এবং ইসিনেটের মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারকে বাইরে রাখা হয়েছে বলেও প্রস্তাবে অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিরোধীদের এই কর্মসূচিকে ‘নাটক’ বলে আখ্যা দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা বলেছেন, বিরোধীদের এই মিছিল গণতন্ত্রের প্রতি অসম্মান এবং পরিকল্পিত বোকামিপূর্ণ নাটক। তিনি অভিযোগ করেন, দেশে অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। তার ভাষায়, ‘তাদের রাজনৈতিক মডেল কী, তা জনগণ জানে। এই সমাবেশ আসলে রাজনৈতিক মঞ্চনাটক।’
এদিকে বিরোধীদের সমাবেশে অংশ নিচ্ছে না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গতকাল দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করে তরুণদের আন্দোলনে সমর্থনের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, দলটি নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখবে এবং বিরোধীদের রোববারের কর্মসূচিতে যোগ দেবে না।
দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, সিআরপিএফ ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যসহ প্রায় ১০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। এর মধ্যে রামলীলা ময়দান ও মিন্টো ব্রিজ থেকে সমাবেশস্থল পর্যন্ত প্রায় চার হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, ভগবান দাস রোড, সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়সংলগ্ন এলাকায় নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মধ্য দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প পথের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রোহিত রাজবীর জানিয়েছেন, পুরো এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। আয়োজকদেরও নিজস্ব নিয়ন্ত্রণকক্ষ রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই পক্ষ সমন্বয় করে কাজ করছে।
বিরোধীদের সমাবেশের পাশাপাশি পশ্চিম দিল্লিতে পাল্টা কর্মসূচি পালন করেছে বিজেপি। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় নিহতদের স্মরণে হরি নগর বাস ডিপো থেকে তিলক নগর মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত মিছিল করে দলটি। এতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, প্রতিমন্ত্রী হর্ষ মালহোত্রা, এইচ এস ফুলকা, মনজিন্দর সিং সিরসা ও বিজেপি সাংসদ বাঁসুরি স্বরাজ অংশ নেন।
এ ছাড়া গুরদুয়ারা শহীদগঞ্জ সাহিবে দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন বিজেপি সাংসদ বিক্রমজিৎ সিং সাহনি। দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরাও বিজেপির কর্মসূচিতে যোগ দেন। কংগ্রেসের সমাবেশের দিনটি ১৯৮৪ সালের দাঙ্গার বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় দলটির সমালোচনা করছে বিজেপি।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে সমাবেশের কারণে যানজট ও সড়ক বন্ধ থাকার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দিল্লির ব্যবসায়ীরাও। দিওয়ালির আগে উৎসবের কেনাকাটার মৌসুমে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
অটোমোটিভ পার্টস মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিনয় নারাং বলেন, প্রতিবাদ করার গণতান্ত্রিক অধিকারকে তারা সমর্থন করেন। তবে সমাবেশের স্থান ও সময় নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও জানান তিনি।
নারাংয়ের ভাষ্য, সমাবেশস্থলের তিন কিলোমিটারের মধ্যে চাঁদনি চক, সদর বাজার, দরিয়াগঞ্জ, মোরি গেট ও কাশ্মীরি গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা রয়েছে। এ ধরনের কর্মসূচির কারণে দিল্লির বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীরা সাধারণত তিন দিন আগে ও পরে শহরে আসা এড়িয়ে চলেন।
সংগঠনটির সহসভাপতি রবিন্দর সিং কোহলি বলেন, এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দৈনিক মজুরির শ্রমিক, কুলি, মালবাহী শ্রমিক ও ঠেলাগাড়িচালকেরা। দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ রুপি আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবার চলে।
অন্যদিকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ধরমপাল রাত্রা ধারণা করছেন, সমাবেশের কারণে ব্যবসায়ীদের দুই হাজার রুপির বেশি ক্ষতি হতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ নাকচ করে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। সমাবেশে আসা ব্যক্তিদের দিল্লিতে কেনাকাটা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাহুল বলেন, প্রতিবাদ, মিছিল ও সমাবেশের পাশাপাশি কিছু কেনাকাটাও করা উচিত। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তার দাবি, সমাবেশে ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি হবে না; বরং বিজেপি ভয় পেয়েই এ নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ