ছবি : সংগৃহীতঘরের মাঠে স্পিন সহায়ক উইকেট বানিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু মিরপুরে সেই পরিকল্পনাই উল্টো বিপদ ডেকে এনেছে। যে উইকেটে স্বাগতিক স্পিনারদের দাপট দেখানোর কথা, সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা নিয়েছেন বাংলাদেশের দ্বিগুণ উইকেট।
ব্যাটিং ব্যর্থতার পাশাপাশি বোলিংয়েও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। ঢাকা টেস্টে ৮ উইকেটের এই হারের পর তাই উইকেট তৈরির পরিকল্পনা ও দলের সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক ক্রিকেটার জাভেদ ওমর বেলিম। তার মতে, গত দুই বছরে পেসারদের ওপর ভর করে টেস্টে যে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল, হঠাৎ স্পিননির্ভর উইকেট বানিয়ে সেই পথ থেকে সরে আসা ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।
সময়ের আলোর সঙ্গে আলাপকালে জাভেদ বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে স্পিন উইকেট বানানোর আগে নিজেদের সামর্থ্য ও প্রতিপক্ষের শক্তি বিবেচনা করা জরুরি ছিল। তার মতে, মানসম্পন্ন স্পিন আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটারদের দুর্বলতা নতুন নয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার কেশব মহারাজের বিপক্ষেও অতীতে সেই সমস্যা দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের স্পিনারদের সুবিধা দিতে গিয়ে উল্টো প্রতিপক্ষের স্পিনারদের জন্য সহায়ক উইকেট তৈরি করা হয়েছে।
জাভেদ যোগ করেন, ‘আমরা স্পিন উইকেট করলাম, যেটা আমাদের ব্যাকফায়ার করল। কোয়ালিটি স্পিনে কিন্তু আমরা অলওয়েজ স্ট্রাগল করেছি। আমরা কিন্তু ওভাবে বোলিংও করতে পারিনি। এ জন্য কিন্তু এই টেস্ট ম্যাচটা আমরা আউটরাইট হারলাম।’
গত দুই বছরে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে পেসারদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন জাভেদ। তার মতে, এই সময়ে পেসাররা নিয়মিত ২০ উইকেট নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছেন। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার বদলে হঠাৎ স্পিননির্ভর উইকেট তৈরির সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক উন্নতির বড় জায়গা ছিল পেস বোলিং।
পাকিস্তানের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে জয় কিংবা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ভালো করার পেছনেও পেসারদের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তাই হঠাৎ উইকেটের ধরন বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত তাকে হতাশ করেছে।
শুধু উইকেটের ধরন নয়, ঘরের মাঠে কীভাবে খেলতে চায় বাংলাদেশ, সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও স্পষ্টতা চান জাভেদ। তার মতে, হোম অ্যাডভান্টেজ নেওয়ার জন্য স্পিন কিংবা পেস সহায়ক উইকেট, যেটিই তৈরি করা হোক, আগে নিশ্চিত হতে হবে সেই কন্ডিশনে নিজেদের খেলোয়াড়দের পারফর্ম করার সামর্থ্য আছে কি না। শুধু ম্যাচ জেতার আশায় প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন উইকেট বানালে উল্টো ফলও হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনও ওই দল হয়ে উঠিনি যে বড় বড় কথা বলে দেব, স্পিন উইকেট বানাব, হোম অ্যাডভান্টেজ নেব। যদি আমরা পরিষ্কার থাকি যে স্পিন উইকেটে খেলতে পারব, কিংবা ফাস্ট বোলিং উইকেটে টিকে থেকে প্রতিপক্ষকে কঠিন সময় দিতে পারব, তা হলে সেটা করা উচিত।
কিন্তু আমাদের বিশ্বাসের জায়গাটা কখনোই পুরোপুরি তৈরি হয়নি। অনেক সময় মিরপুরে বাজে উইকেটে জিতেছি, কিন্তু সেটা টাচ অ্যান্ড গো জয় ছিল। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যাকফায়ারের সম্ভাবনাটাও ভাবতে হবে।’
এই হারের পর বাংলাদেশের বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে সামনে ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলার সুযোগ রয়েছে বলে এখনই আশা ছাড়তে চান না জাভেদ। বরং পরবর্তী সিরিজগুলোর প্রস্তুতি কীভাবে নেওয়া হচ্ছে, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। তার মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের আগে স্পিনিং ট্র্যাকে খেলার অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসবে, সেটিও ভাবতে হবে। বিশেষ করে মিরপুরের ধীরগতির উইকেটে খেলার পর অল্প সময়ের ব্যবধানে পেস ও বাউন্সের কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় একটা কথা বলি, আমরা বিশেষ করে বিশ^কাপ বা এশিয়া কাপে কী করছি, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পুরো বছরে আমরা কী করছি। প্রতিটি দেশই হোম অ্যাডভান্টেজ নেয়। আমরাও এর আগে নিয়েছি। কিন্তু গত দুই বছর পেস বোলিংয়ে আমরা খুব ধারাবাহিক ছিলাম। ২০টি উইকেট নিচ্ছিল পেসাররা, এরপর স্পিনাররা। সেই জায়গা থেকে আমরা কেন আবার পরিবর্তন করলাম, সেটা ম্যানেজমেন্টই ভালো বলতে পারবে। এটার একটা পোস্টমর্টেম হওয়া উচিত।
ভবিষ্যতে আমরা কীভাবে খেলতে চাই, পুরো বছরের পরিকল্পনা কী হবে, সেটা পরিষ্কার করা দরকার।’
বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়েও কথা বলেছেন সাবেক এই ওপেনার। তার ভাষ্যে, ‘আমার মনে হয় সবাইকে নিয়ে অনেক মন্তব্য করা হয়। কিন্তু একটা খেলোয়াড়কে টপ লেভেলে ধারাবাহিক পারফর্ম করতে হলে অন্তত ৩০-৪০টি টেস্ট ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা দরকার। এরপর সে প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন কোনো খেলোয়াড় দলে এলে শুরুতে চাপ থাকে না, কিন্তু ধীরে ধীরে তার ওপর দায়িত্ব বাড়ে। তখন অজান্তেই চাপ তৈরি হয়। তানজিদ টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেতে খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু টেস্টে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে ওকে আরও সময় দিতে হবে।’
ঢাকা টেস্টে জয়ের আশা জাগিয়ে হতাশার হার উপহার দিয়েছে নাজমুল শান্ত, মুমিনুল, লিটনরা। ৫ নভেম্বর সিলেটে শুরু হবে সিরিজে দ্বিতীয় এবং শেষ টেস্ট। সেখানে ঘুরে দাঁড়াবে দল এমনই প্রত্যাশা জাভেদ ওমরের।
সময়ের আলো/এসএকে