মো. ফাহিম, চরফ্যাশন(ভোলা)
জলাভূমিতে নেমে কুঁচে শিকারে শিকারি। ছবি : সময়ের আলো সকাল থেকে সন্ধ্যা। কখনো কোমর সমান পানি, কখনো হাঁটু ভরা কাদামাটি। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জলাভূমিতে নেমে কুঁচে শিকার করেন তারা। কারও হাতে বাঁশের তৈরি ফাঁদ, কারও হাতে কুঁচে ধরার সরঞ্জাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরিশ্রমের পর যা পাওয়া যায়, তা বিক্রি করেই চলে সংসার। সেই আয়ে জোটে দুবেলা খাবার, চলে সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। জীবনের ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই এভাবেই দিন কাটছে চরাঞ্চলের দরিদ্র কুঁচে শিকারিদের। তাদের কাছে কুঁচে শিকার নিছক পেশা নয়, বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।
ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় ও আশপাশের এলাকায় দেখা যায় এমন জীবনসংগ্রামের চিত্র। স্থানীয়ভাবে কুঁচে শিকারকে কেউ বলেন ‘কুচি ধরা’, আবার কেউ বলেন ‘কুঁচে মারা’। দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়েই তাদের অনেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন।
এমনই একজন কুঁচে শিকারি অবিনাশ সরকার। তার সঙ্গে একই পেশায় যুক্ত রয়েছেন হরিপদ সরকারের মতো আরও অনেকে। অভাবের সংসারে অন্য কাজের সুযোগ না থাকায় বছরের পর বছর জলাশয়ে কুঁচে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তারা।
অবিনাশ সরকার বলেন, ‘কুঁচে ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করি। প্রতিদিন জলাশয়ে নামতে হয়। কোনো দিন বেশি কুঁচে পাই, আবার কোনো দিন অনেক কষ্ট করেও তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তারপরও পেটের তাগিদে এ কাজ করতে হয়। অন্য কোনো কাজের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এভাবে কষ্ট করতে হতো না।’
একই পেশায় নিয়োজিত হরিপদ সরকার বলেন, ‘কুঁচে শিকার করা সহজ কাজ নয়। কাদাপানি ও জলাশয়ে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়। কুঁচে বেশি পেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে, আর কম পেলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের জন্য নিয়মিত কাজের সুযোগ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে অনেক উপকার হতো।’
কুঁচে শিকারে ব্যবহার করা হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘দোয়াইর’ বা ‘কাঁদা’ নামে পরিচিত। বাঁশ-বেত ও প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ জলাশয়ের কাদামাটি ও গাছপালার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বসানো হয়। পরে ফাঁদে কুঁচে প্রবেশ করলে তা সংগ্রহ করেন শিকারিরা।
জলাশয়ের গভীরতা, কাদার ধরন ও কুঁচিয়ার বিচরণস্থল বুঝে ফাঁদ বসাতে হয়। এ কাজে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জলাশয়ের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে শিকারিদের কাজের ধরনও বদলে যায়। তবে তাদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের সংগ্রহের ওপর। ফলে কোনোদিন ভালো আয় হলেও কোনোদিন খালি হাতেই ফিরতে হয়।
সংগৃহীত কুঁচে স্থানীয় বাজার ও পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন শিকারিরা। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কুঁচে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে মৌসুম, আকার, চাহিদা ও বাজারভেদে দাম কমবেশি হয়। ওসমানগঞ্জের লতিফ মিয়ার হাটসহ আশপাশের বাজারগুলোতে চলে কুঁচিয়ার কেনাবেচা। স্থানীয় পাইকাররা শিকারিদের কাছ থেকে কুঁচে সংগ্রহ করে চাহিদা অনুযায়ী অন্য বাজারে সরবরাহ করেন।
কুঁচিয়ার পাইকার হালিম মুন্সি বলেন, ‘স্থানীয় শিকারিরা জলাশয় থেকে কুঁচে ধরে আমাদের কাছে বিক্রি করেন। এরপর চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো অন্য বাজারে সরবরাহ করা হয়। কুঁচিয়ার দাম ও চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। শিকারিরা ন্যায্যমূল্য পেলে তাদের কষ্ট কিছুটা সার্থক হবে। এ ব্যবসাকে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নিতে সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের উন্নত ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
স্থানীয়ভাবে কুঁচে শিকারি ও পাইকারদের মধ্যে গড়ে উঠেছে কেনাবেচার একটি অর্থনৈতিক চক্র। তবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের আধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় এ খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শিকারিরা সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ পেলে তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
কুঁচে শুধু স্থানীয় মানুষের জীবিকার উপকরণ নয়, এর রয়েছে বাণিজ্যিক গুরুত্বও। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুঁচিয়ার চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জলাভূমিনির্ভর এ পেশা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কুঁচে সাধারণত জলাশয়, বিল, খাল ও কাদাযুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। তবে কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় শিকারিদের জীবিকা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে দেশীয় জলজ প্রাণীর বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে কুঁচিয়ার প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর ওপর।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণ, কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, শিকারিদের প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত হতে পারে। চরাঞ্চলের এসব কুঁচে শিকারির অধিকাংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের নেই স্থায়ী কর্মসংস্থান, নেই সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অথচ তাদের শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জলজ সম্পদ আহরণ ও বাজার অর্থনীতির একটি অংশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কুঁচে শিকারিদের তালিকা তৈরি, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ সংগ্রহ ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলাভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পেটের দায়ে প্রতিদিন যারা জলাশয়ের কাদামাটিতে নেমে কুঁচে খোঁজেন, তাদের কাছে এ কাজই জীবনের সম্বল। জলাশয়ের পানি আর কাদামাটির সঙ্গে মিশে আছে তাদের বেঁচে থাকার গল্প। চরফ্যাশনের এসব প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও জীবিকার নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
সময়ের আলো/জোই