জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এরই মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। এ বিষয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। একইসঙ্গে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঢাকা এবার চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে ভারতের উদ্বেগে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
এই প্রেক্ষাপটে নিজেদের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ‘চিকেনস নেক’ করিডোরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ভারত। এর অংশ হিসেবে সংবেদনশীল এই এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে দেশটি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এই পরিকল্পনার কথা জানান।
শিলিগুড়ি করিডোর নামেও পরিচিত এই অঞ্চলটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য, যা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নামে পরিচিত—সংযুক্ত রাখার একমাত্র স্থলপথ। ভৌগোলিক দিক থেকে করিডোরটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, কোনো কোনো স্থানে এর প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার। এই কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চলের চারপাশে রয়েছে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান, আর অল্প দূরত্বেই অবস্থিত চীনের সীমান্ত। যুদ্ধ বা সংকটকালে যদি এই করিডোরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় বাজেটে রেল মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে গিয়ে বৈষ্ণব বলেন, দেশের বাকি অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে এই ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ কৌশলগত করিডোরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান রেলপথকে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের (এনএফআর) জেনারেল ম্যানেজার চেতন কুমার শ্রীবাস্তব জানান, ভূগর্ভস্থ রেলপথের অংশটি পশ্চিমবঙ্গের থ্রি মাইল হাট ও রাঙাপানি স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় নির্মিত হবে। তার ভাষায়, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভূগর্ভস্থ অংশটির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
এছাড়া এই রেলপথের একটি শাখা পশ্চিমবঙ্গের বাগডোগরা অঞ্চলের দিকে সম্প্রসারিত হবে, যা ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভূগর্ভস্থ রেললাইনগুলো ভূমি-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৪ মিটার গভীরে স্থাপন করা হবে। বর্তমানে থাকা দুই লেনের রেলপথকে সম্প্রসারণ করে চার লেনে উন্নীত করা হবে। সব মিলিয়ে এই কৌশলগত করিডোরে মোট ছয়টি রেললাইন থাকবে—এর মধ্যে চারটি থাকবে ভূপৃষ্ঠে এবং দুটি ভূগর্ভে।
দীর্ঘদিন ধরেই ‘চিকেনস নেক’ করিডোরকে ভারতের একটি দুর্বল কৌশলগত এলাকা হিসেবে দেখা হয়। এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে জরুরি রসদ সরবরাহ ও সেনা চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, যার ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল দেশের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
/ইউএমএইচ