পঞ্চগড়-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ও এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলম। ছবি : সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন সামনে রেখে দেশের সংসদীয় আসনের প্রথম আসন হিসেবে পঞ্চগড়ের নির্বাচনি মাঠে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। বিশেষ করে পঞ্চগড়-১ (তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী ও সদর) আসনে লড়াই এখন দ্বিমুখী।
তবে জোরদার প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন জাসদের সাবেক এমপি নাজমুল হক প্রধানসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। তাদের অবস্থানও বেশ শক্ত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পঞ্চগড়-১ আসনটির হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের বিপরীতে শুরুর দিকে পিছিয়ে থাকলেও জামায়াতের সমর্থনে শেষ মুহূর্তে এসে শক্তিশালী অবস্থানে উঠে এসেছেন জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলম। নতুন মুখ ও বয়সে কম হিসেবে প্রতিপক্ষ সমালোচনার তীর ছুড়লেও সারজিসের পক্ষ নিয়ে পাল্টা জবাব দিচ্ছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা।
বয়স কম হলেও শিক্ষা ও মেধায় সারজিসের যোগ্যতা মোটেও কম নয়, এমন যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের সমালোচনাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে কড়া জবাব দিচ্ছেন আসনটির জামায়াতের আমির মাওলানা ইকবাল হোসাইন।
সারজিসের তুরুপের তাস জামায়াত
নির্বাচনি প্রচারের শুরুর দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এককভাবে খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও ১১ দলীয় জোট গঠনের পর দৃশ্যপট বদলে যায়।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা ইকবাল হোসাইন জনসভায় ঘোষণা দিয়েছেন, দাঁড়িপাল্লা মানেই শাপলা কলি, শাপলা কলি মানেই দাঁড়িপাল্লা। জামায়াতের সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী এখন সারজিস আলমের নির্বাচনি প্রচারের প্রধান হাতিয়ার।
স্থানীয়রা মনে করছেন, জামায়াতের ভোট ব্যাংকের পূর্ণ সমর্থন সারজিসকে সমান্তরাল লড়াইয়ে নিয়ে এসেছে। তবে সারজিস আলমের অভিযোগ, একটি পক্ষ ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা এবং গুজব ছড়িয়ে নানাভাবে প্রচারে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এমনকি ভোট কেনার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও হুঙ্কার দিয়েছেন এই তরুণ নেতা।
শনিবার দুপুরে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের মোলানী গ্রামে আয়োজিত নির্বাচনি পথসভায় প্রতিপক্ষ দলের হুমকির বিষয়ে ভোটারদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কারও ভয় বা ধমকে প্ররোচিত হবেন না। যারা সত্যিকারের সেবক হতে পারবে তাদেরই বেছে নিন। আমরা জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছি কারণ তাদের ব্যবহার ভালো। তারা মানুষের ওপর জুলুম বা নির্যাতন করে না। আমরা সবসময় ভালো মানুষের সঙ্গেই থাকতে চাই। ওই
জনসভায় সারজিস আলম আরও বলেন, আমাদের কাছে কোনো চাঁদার টাকা নেই যে তা দিয়ে ভোট কিনব। আমি স্পষ্ট করে বলছি, টাকা দিয়ে আমি একটি ভোটও কিনব না। আপনারা যদি মনে করেন এলাকার উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং সম্মান প্রয়োজন তবে বিবেককে প্রশ্ন করে শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দিন। আপনারা বিনা টাকায় আগামী কয়েকটি দিন আমাদের জন্য কাজ করবেন। বিনিময়ে আগামী ৫ বছর আপনাদের সব দায়িত্ব আমি নেব। আমরা এই বাংলাদেশে বিনা টাকায় ভোট এবং বিনা টাকায় সেবার সংস্কৃতি চালু করতে চাই।
নওশাদ জমিরের শক্তির উৎস বাবার উন্নয়ন ও স্বচ্ছ ইমেজ
আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ নওশাদ জমিরের মূল শক্তি তার বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বিশাল জনপ্রিয়তা। এলাকার মানুষ মনে করে, জমির উদ্দিন সরকার তেঁতুলিয়া ও পঞ্চগড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার বিস্তারে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন তার প্রতিদান হিসেবে নওশাদ জমির বিপুল ভোট পাবেন।
শনিবার তেঁতুলিয়া উপজেলার চৌরাস্তায় ঐতিহাসিক তেঁতুলতলায় বিএনপি আয়োজিত বিশাল এক নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিপক্ষের প্রচারের সমালোচনা করে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বলেন, তেঁতুলিয়া ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জন্মভূমি। এই মাটির সাতটি ইউনিয়নে ধানের শীষের ভোট নেই বলে যে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা হাস্যকর। ভোটাররাই ব্যালটের মাধ্যমে এর যোগ্য জবাব দেবেন।
জনসভায় তিনি আরও বলেন, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়, এটা ইতিহাস গড়ার লড়াইয়ের নির্বাচন। আগামী ৫০ বা ১০০ বছর পর যারা বাংলাদেশের ইতিহাস লিখবে তারা দেখবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে পঞ্চগড়ের মানুষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আপনারা যদি সেই ইতিহাসের অংশীদার হতে চান তবে ধানের শীষে ভোট দিয়ে ইতিহাস গড়তে হবে। আপনার একটি ভোটই নির্ধারণ করবে আগামীর বাংলাদেশ কি জুলুমের হবে নাকি ইনসাফের।
গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য তারেক রহমানকে নির্বাচনে জয়ী করে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে মিথ্যা মামলা ও পুলিশের হয়রানি বন্ধ হবে, সাধারণ মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
স্থানীয়রা বলছেন, স্বচ্ছ রাজনৈতিক ইমেজ এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি নওশাদ জমিরকে ভোটের লড়াইয়ে অন্যতম ফেভারিট হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। নওশাদ জমির তার প্রচারে নতুনত্ব এনেছেন পথনাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে যেখানে বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসন ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশের রূপরেখাও তুলে ধরা হচ্ছে।
জনসভায় বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। ছবি : সংগৃহীত
এ ছাড়া পঞ্চগড়ে ‘তোমার কথা শুনবে বাংলাদেশ’ শীর্ষক বাংলা রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করে বিজয়ীদের হাতে চার লাখ টাকার পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান, রিলস প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের আইফোন পুরস্কার প্রদান আর ভোটের প্রচারে অ্যানিমেশন ব্যবহারসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নির্বাচনি প্রচারে অন্য দলের তুলনায় এগিয়ে রয়েছেন।
পঞ্চগড়-২ আসনের চিত্র : পাশের আসন পঞ্চগড়-২ (দেবীগঞ্জ ও বোদা) এলাকায় লড়াই হচ্ছে মূলত বিএনপির ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং জামায়াতে ইসলামীর সফিউল আলমের মধ্যে। সেখানেও প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পঞ্চগড়ের দুটি আসনেই জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে সংখ্যালঘু (সনাতন ধর্মাবলম্বী) এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট।