তৃতীয়বারের মতো যুদ্ধের ছায়ায় রমজান পালন করছে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভূখণ্ড গাজা উপত্যকা। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও শোক, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা এখানকার মানুষের জীবন থেকে সরে যায়নি। ঘরবাড়ি হারানো হাজারও পরিবার এবারও ইফতার করছে তাঁবুর নিচে, প্রিয়জনহারা মানুষ স্মৃতির ভার নিয়ে কাটাচ্ছে সিয়ামের দিন।
যুদ্ধবিরতির মাঝেও ভারী আকাশ : বিশ্বনেতারা ওয়াশিংটনে জড়ো হয়ে পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ঘোষিত বোর্ড অব পিসের প্রথম বৈঠকে গাজার পুনর্গঠনে অর্থ সহায়তার কথা বলেছেন। কিন্তু গাজার সাধারণ মানুষের কাছে এসব ঘোষণা এখনও দূরের শব্দ। তাদের বাস্তবতা ভাঙা ঘর, হারানো পরিবার, অনিশ্চিত আগামী। গত জানুয়ারির যুদ্ধবিরতি রমজানের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা মানুষকে আশাবাদী হতে দিচ্ছে না।
শোকের মাস, হারানোর হিসাব : ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া লাগাতার হামলায় ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। প্রতিটি পরিবারে শোকের ছাপ। নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত জিয়াদ ধায়ের বলেন, রমজানের আনন্দ এখন স্মৃতির বিষয়। বন্ধুদের বেশিরভাগই আর বেঁচে নেই। পরিবারের প্রিয়জনরাও শহিদ হয়েছেন। একসময় ইফতারে নিমন্ত্রণ, আলো ঝলমলে সজ্জা আর মিলনমেলা ছিল তার জীবনের অংশ; এখন সেগুলো কেবল স্মৃতি।
ইয়েলো লাইনের নিষেধাজ্ঞা : যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী উত্তর ও পূর্ব গাজায় একটি সামরিক নিষিদ্ধ এলাকা ‘ইয়েলো লাইন’ চালু রয়েছে। এই সীমারেখা ধীরে ধীরে পশ্চিমে সরিয়ে প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা কার্যত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। ফলে বহু মানুষ এখনও নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না। জিয়াদ বলেন, নিজের ঘরের ধ্বংসস্তূপটুকুও দেখতে না পারা সবচেয়ে কষ্টের। তার বাড়ি এখন এমন এলাকায়, যেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
তাঁবুর ভেতর রমজান : উম্মে মোহাম্মদ আবু কামার আগে থাকতেন জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে। এবার তাকে থাকতে হচ্ছে মধ্য গাজার অস্থায়ী তাঁবুতে। নিজের শহর খান ইউনিসের সমুদ্রতীরে শিশুদের ‘ওয়েলকাম রমজান’ লেখা বালুর ভাস্কর্য হয়তো কিছুটা সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু বাস্তব জীবন কঠিন। দুই বোন ও দুই জামাইকে হারিয়ে এবারের রমজান তার কাছে নিঃসঙ্গতার প্রতীক।
বাজারে পণ্য আছে, সামর্থ্য নেই : গত দুই বছরের চেয়ে এবার বাজারে কিছুটা পণ্য দেখা যাচ্ছে। তবু অর্থনৈতিক ধ্বংস এমন পর্যায়ে যে বেশিরভাগ মানুষ কিনতে পারছেন না। গাজার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। কাজ হারিয়ে আছেন হাজারো মানুষ। গাজা সিটির বাসিন্দা ফুয়াদ হিজাজি বলেন, আগে পণ্য ছিল না, এখন আছে, কিন্তু কিনতে পারি না। তারা এখনও দাতব্য রান্নাঘরের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
আগুন জ্বেলে ইফতার : যুদ্ধবিরতির শর্তে রান্নার গ্যাস ঢোকার কথা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। ফলে অনেক পরিবার আবারও জ্বালানি কাঠে রান্না করছে। দিনভর পানি সংগ্রহ, কাঠ কুড়ানো এসবেই কেটে যায় সময়। দুপুরে পাওয়া খাবার ইফতারের সময় ঠান্ডা হয়ে যায়, আবার আগুন জ্বালিয়ে গরম করতে হয়। এই কষ্টের মধ্যে ধর্মীয় আচার পালনের চেষ্টা মানুষকে মানসিক শক্তি জোগায়।
শোকের সঙ্গে প্রতিরোধের ঈমান : রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা শোনামাত্র অনেকের চোখে জল এসেছে। প্রিয়জনের অনুপস্থিতি যেন আরও তীব্র হয়ে ওঠে এই মাসে। একসময় পরিবার-পরিজন নিয়ে যে আনন্দ ভাগাভাগি হতো, তা এখন নেই। তবু মানুষ নামাজ, দোয়া ও সংযমের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজছে। তাঁবুর অন্ধকারে ছোট্ট বাতি জ্বেলে ইফতার করা যেন এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ।
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা : আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুদ্ধবিরতির পরও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী শত শত মানুষ এখনও নিহত বা আহত হচ্ছেন। অন্যদিকে চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ল্যানচেট জানিয়েছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। এই বাস্তবতায় গাজার মানুষের কাছে রমজান মানে শুধু সংযম নয়, টিকে থাকার লড়াই। শান্তির প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা সময়ই বলবে; আপাতত তাদের প্রতিটি দিন কাটছে প্রার্থনা ও অপেক্ষায়।
সময়ের আলো/এনএ