সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ (সামেক) হাসপাতালের ১৯টি কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ১৬টি গত নয় মাস ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এতে জেলার পাঁচ শতাধিক কিডনি রোগী চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বিশেষ করে গরীব রোগীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। বার বার তাগিদ দিয়েও নতুন মেশিন বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না বলেন জানিয়েছে সামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, জেলার একমাত্র সরকারি খরচে কিডনি ডায়ালাইসিস করা হয় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ২০১৫ সাল থেকে কিডনি রোগীরা খুব কম খরচে এ হাসপাতাল থেকে কিডনি ডায়ালাইসিস করেন। এখানে কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে খরচ হয় মাত্র ৪০০ টাকা। যা বেসরকারিভাবে করলে কমপক্ষে পাঁচ হাজার টাকা ব্যয় হয়।
কিন্তু গত নয় মাস যাবত সাতক্ষীরার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৬টি কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট হয়ে আছে। যে তিনটি সচল রয়েছে, তাতেও সিরিয়াল পেতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা। এতে করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দূর-দুরন্ত থেকে আসা কিডনি রোগীরা ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন স্টাফ জানান, শুরু থেকেই সামেক হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন অপারেট করার মতো দক্ষ কোনো লোক ছিল না। যে কারণে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে আস্তে আস্তে একটি একটি করে মেশিন নষ্ট হতে থাকে। ফলে ক্রমশ চাপ বাড়তে থাকে বাকি মেশিনগুলোর উপর। নষ্ট মেশিনগুলো সময়মতো মেরামত না করায় বর্তমানে হাসপাতালে মাত্র তিনটি মেশিন চালু আছে। যা দিয়ে তালিকাভুক্ত প্রায় শতাধিক কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার নয়াখালী গ্রামের সাইফুল্লাহ জানান, গত চারদিন আগে তার বৃদ্ধা মা সালেহা খাতুনকে (৬৫) কিডনি ডায়ালাইসিস করার জন্য সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারেন অধিকাংশ ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট। যে কয়টা সচল আছে তাতে সিরিয়াল পেতে এক থেকে দেড় মাস লাগবে।
তিনি আরও বলেন, উপায় না পেয়ে সিরিয়ালের অপেক্ষায় মাকে বর্তমানে আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউ থেকে বার বার তাকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে রোগীকে খুলনা বা অন্য কোথাও নিয়ে ডায়ালাইসিস করানোর জন্য। তবে আর্থিক সক্ষমতা না থাকায় অসুস্থ মাকে তিনি অন্য কোথাও নিতে পারছেন না বলে জানান।
শুধু সাইফুল্লাহর মা সালেহা খাতুন নয়, প্রতিদিন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অসংখ্য কিডনি রোগীরা ফিরে যাচ্ছেন ডায়ালাইসিস বা চিকিৎসা সেবা করতে না পেরে।
সামেক হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সিদ্ধার্থ বাওয়ালি জানান, এই জেলায় পাঁচ শতাধিক কিডনি রোগী রয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০ মতো রোগী হাসপাতালে আসেন ডায়ালাইসিস সেবা নেওয়ার জন্য। কিন্তু জরুরি ডায়ালাইসিস লাগবে এমন অল্প কিছুসংখ্যক রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। ফলে রোগীর চাপের কারণে প্রতিদিন আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালের এই ইউনিটের ১৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে মাত্র ৩টি মেশিন সচল আছে। বাকিগুলো সব বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। এগুলো আর মেরামত করা যাবে না। এই তিনটি মেশিন দিয়ে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ২২৭ জন কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়েছে।
সাতক্ষীরার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাক্তার মো. কুদরত-ই খোদা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ২০১৫ সালের দিকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জাপান ও জার্মান থেকে আমদানি করা ১৯ টি ডায়ালাইসিস মেশিন স্থাপন করা হয়। ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই আমি যোগদান করার পর মাত্র ২টা ডায়ালাইসিস মেশিন ভালো পেয়েছিলাম। পরে আরও ১২টা মেশিন ঠিক করেছিলাম। কিন্তু ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে ২০২৫ সালের জুন এসে দেখা গেছে মোট ১৬টি মেশিন খারাপ হয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, নতুন মেশিন লাগবে। সেই থেকে নতুন ৬টা মেশিনের জন্য চাহিদা পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভিন্ন সেকশনে একাধিকবার কথা বলেছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।
এফআর