ইরানে কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালায়। ওই হামলায় বহু মানুষের পাশাপাশি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও নিহত হন বলে দাবি করা হয়। এর পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েলি স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করে তেহরান। সেই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়েও হামলার খবর প্রকাশিত হয়।
ইরানের পাল্টা হামলার পর নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়েছেন—এমন খবরও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার (১০ মার্চ) ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয় নেতানিয়াহু নিহত বা আহত হয়ে থাকতে পারেন।
তবে ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর ওপর হামলার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ দেওয়া হয়নি। বরং এতে কয়েকটি পরিস্থিতিগত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে নেতানিয়াহুর নতুন ভিডিও ক্লিপ না থাকা, হিব্রু ভাষার গণমাধ্যমে তার বাসভবনের চারপাশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন, জ্যারেড কুশনার ও মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সম্ভাব্য সফর স্থগিত হওয়া এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও নেতানিয়াহুর কথিত ফোনালাপের একটি ফরাসি ভাষার পাঠ—যেখানে আলাপের নির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
তাসনিমের প্রতিবেদনে রুশ গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়ে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্কট রিটারের একটি দাবিও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ইরান নেতানিয়াহুর অবস্থানস্থলে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং তার ভাই নিহত হয়েছেন। তবে এই তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ বা অস্বীকৃতি পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে দ্য জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, এ ধরনের প্রতিবেদন ইরান ও ইরানপন্থি তথ্যযুদ্ধের একটি পরিচিত কৌশল হতে পারে। তাদের মতে, বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন তথ্যকে একত্র করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে মনে হয় কোনো গোপন ঘটনা ঘটেছে।
তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে সাধারণত ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বা সংশ্লিষ্ট বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগও এই গণমাধ্যমকে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নেতানিয়াহুর একটি সরকারি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া ইসরায়েলি সরকারের ওয়েব পোর্টালেও ৬ মার্চ তাকে বিয়ারশেবার একটি স্থান পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে স্বাধীন বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার জনসম্মুখের কর্মকাণ্ডের কথাও উঠে এসেছে। এর মধ্যে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সঙ্গে একটি ফোনালাপের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা এলিসি প্রাসাদ জানিয়েছে এবং ৫ মার্চ দ্য জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালে নেতানিয়াহুর অবস্থান নিয়ে ইরানের এ ধরনের দাবি এই প্রথম নয়। টাইমস অব ইসরায়েলের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতেও ইরানি সামরিক বাহিনী বলেছিল নেতানিয়াহুর ভাগ্য ‘অস্পষ্ট’। তবে তখন নেতানিয়াহুর কার্যালয় ওই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়।
২ মার্চ চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছিল, জেরুজালেমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছাকাছি এলাকায় বসবাসকারীরা ইরানের দাবির পরও কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চিহ্ন দেখতে পাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত পরিবর্তিত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো নতুন ভিডিও না থাকা, অস্পষ্ট সরকারি বিবৃতি বা কোনো সফরের সময়সূচি পরিবর্তন হওয়া সহজেই নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিতে পারে। তাসনিমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটিও সম্ভবত তেমন একটি উদাহরণ।
দ্য জেরুজালেম পোস্টের মতে, এসব তথ্য থেকে নেতানিয়াহু নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এছাড়া যুদ্ধের সময় ইসরায়েলে শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায়ই পরিবর্তিত হয় এবং অনেক সময় সরকারি যোগাযোগ লিখিত বিবৃতির মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এসব বিষয় কোনোভাবেই হত্যাকাণ্ড বা গুরুতর আহত হওয়ার প্রমাণ নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য জনসম্মুখ সূত্র তাসনিমের উত্থাপিত দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
/ইউএমএইচ