রমজানের ইফতার সচেতনতা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মতামত

পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক বিশেষ সময়। এই মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা

2026-03-14T02:42:41+00:00
2026-03-14T02:42:41+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
রমজানের ইফতার সচেতনতা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ২:৪২ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের এক বিশেষ সময়। এই মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখার মাধ্যমে মানুষ কেবল ধর্মীয় ইবাদতই পালন করে না, বরং নিজের জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করে। সারা দিন ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ সংযম শেখে, আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্জন করে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতার বোধ জাগ্রত হয়। দিনের দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতারের সময় শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই ইফতারের খাবার শুধু পেট ভরানোর মাধ্যম নয়, এটি হতে হবে স্বাস্থ্যকর, পুষ্টিকর এবং সুষম।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে রমজান এলেই ইফতারের টেবিলে ভাজাপোড়া খাবারের আধিক্য বেড়ে যায়। সমুচা, পিঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ, পুরি বা অন্যান্য তেলে ভাজা খাবার অনেকের কাছে ইফতারের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার অতিরিক্ত তাপে বা দীর্ঘ সময় ধরে ভাজা হলে এর মধ্যে কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান তৈরি হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

রমজানে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো- অতিরিক্ত তাপে খাবার ভাজা থেকে বিরত থাকুন। খাবার যখন খুব বেশি তাপে ভাজা হয়, তখন তা দ্রুত পুড়ে যায় এবং ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। তেলের তাপমাত্রা যত বেশি হয়, খাবারে অ্যাক্রাইলামাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর যৌগের পরিমাণ তত বেশি হয়। এই ক্ষতিকর উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে জমে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই ইফতারে খাবার প্রস্তুত করার সময় মাঝারি তাপে ধীরে ধীরে ভাজা উত্তম।
আরও পড়ুন

খাবারের রং কালো বা গাঢ় বাদামি এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার পুড়ে গাঢ় বাদামি বা কালচে হয়ে যায়। অনেকেই মনে করেন, বেশি পুড়ে যাওয়া খাবারই মচমচে ও সুস্বাদু। কিন্তু বাস্তবে, এই ধরনের খাবার স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। তাই ইফতারে ভাজা খাবার এমনভাবে প্রস্তুত করুন যাতে এটি হালকা বাদামি হয় এবং পুষ্টিগুণ বজায় থাকে।

একই তেল বারবার ব্যবহার না করা
বাজারের দোকান বা ছোট রেস্তোরাঁতে প্রায়ই একই তেল বারবার ব্যবহার করা হয়। একাধিকবার ব্যবহার করা তেল তার প্রাথমিক গুণগত মান হারায় এবং ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হয়। এমন তেলে ভাজা খাবার শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বাড়িতে তেল ব্যবহার করার সময় নতুন তেল ব্যবহার করুন, এবং পুনরায় ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।

অল্প তেলে রান্নার অভ্যাস গড়ে তুলুন
অল্প তেলে রান্না করা খাবার হালকা ও সহজপাচ্য হয়। বেশি তেলে ভাজা খাবার হজমে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি ও চর্বি সরবরাহ করে। তাই স্বাস্থ্যকর ইফতার তৈরি করতে অল্প তেল ব্যবহার করুন।

ইফতার শুরুতে খেজুর ও পানি গ্রহণ করুন
প্রাচ্য ও ইসলামিক রীতিতে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা সুপরিচিত। খেজুর দ্রুত শক্তি জোগায় এবং রোজাদারের শরীরকে সতেজ রাখে। পানি পান করলে শরীরের পানিশূন্যতা দূর হয় এবং হজম প্রক্রিয়া সহজ হয়।

ফলমূল ও সালাদ অন্তর্ভুক্ত করুন
ফলমূল শরীরকে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ সরবরাহ করে। সালাদ হজমে সহায়তা করে এবং শরীরকে সতেজ রাখে। ইফতারির টেবিলে প্রতিদিন অন্তত একটি ধরনের ফলমূল ও সালাদ রাখা উচিত।

দই বা স্যুপ অন্তর্ভুক্ত করুন
দই প্রোবায়োটিক সরবরাহ করে যা হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। স্যুপ শরীরকে প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি দেয়, বিশেষ করে গরম বা ঠান্ডা সময়ে।

ভাজা খাবারের পরিমাণ সীমিত করুন
ভাজাপোড়া খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না, তবে এর পরিমাণ কমিয়ে আনা জরুরি। পরিমিতভাবে খেলে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না এবং হজম সহজ হয়।

সেহরিতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন
সেহরিতে শর্করা, প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার খেলে সারা দিন শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়। ডাল, ডিম, দুধ ও বাদাম খেলে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা ও ক্লান্তি কম হয়।

পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করুন
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। পানিশূন্যতা মাথা ব্যথা, ক্লান্তি এবং শরীর দুর্বলতার কারণ হতে পারে।

অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলুন
অতিরিক্ত মিষ্টি ক্যালোরি বাড়িয়ে স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তাই মিষ্টি সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।

ধীরে ধীরে খাবার গ্রহণ করুন
দ্রুত খাবার খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে। ইফতারে খাবার ধীরে ধীরে খেলে পেট হজমে সহায়তা করে এবং শরীরকে স্বস্তি দেয়।

অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার কম খান
অতিরিক্ত লবণ শরীরে পানিশূন্যতা এবং উচ্চ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই খাবারে লবণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন।

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন
ডাল, মাছ, ডিম বা বাদাম শরীরের প্রোটিন সরবরাহ করে, যা শরীরকে শক্তি এবং দীর্ঘসময় কর্মক্ষক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

বয়স্কদের জন্য হালকা খাবার নির্বাচন করুন
বয়স্কদের হজম শক্তি কম থাকে। তাই তাদের জন্য সহজপাচ্য ও হালকা খাবার নির্বাচন করা প্রয়োজন।

শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা তৈরি করুন
শিশুরা ভাজাপোড়া খাবারের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। অভিভাবকদের উচিত তাদের পুষ্টিকর খাবারের প্রতি উৎসাহিত করা।

বাইরে থেকে ইফতার কেনার ক্ষেত্রে সতর্কতা
অনেকে বাজারের ইফতারিতে একই তেল বারবার ব্যবহার করে। তাই বাইরে থেকে খাবার কেনার ক্ষেত্রে মান ও স্বাস্থ্যবিধি যাচাই করা উচিত।

রান্নার সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। নোংরা পরিবেশে খাবার হজমে সমস্যা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

সংযম ও পরিমিতি বজায় রাখুন
রমজানের মূল শিক্ষা হলো আত্মসংযম। ইফতারের সময় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ না করে পরিমিতভাবে খাওয়া উচিত।

খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করুন
শাকসবজি, শস্য ও ফলমূল সতেজ ও স্বাস্থ্যকর কি না নিশ্চিত করা জরুরি। পুষ্টিগুণ বজায় রাখার জন্য তাজা উপাদান ব্যবহার করুন।

প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করুন
প্রিজারভেটিভ বা অতিরিক্ত রঙের বদলে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করুন। এতে খাবারের স্বাদও স্বাস্থ্যদুইই বজায় থাকে।

ক্যালোরি ও পুষ্টি ভারসাম্য বজায় রাখুন
খাবার শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিকরও হওয়া উচিত। প্রতিটি খাবারে যথাযথ পরিমাণ শর্করা, প্রোটিন ও আঁশ থাকলে শরীর সুস্থ থাকে।

শরীরের সংকেত শুনুন
অধিক ক্ষুধা বা অজ্ঞান মাত্রা এড়িয়ে স্বাভাবিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ করুন। পেট ভরে গেলে অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।

খাদ্যাভ্যাসকে রোজার সঙ্গে সামঞ্জস্য করুন
সেহরি ও ইফতারের খাবারের ধরন সারা দিন শক্তি ধরে রাখার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। হালকা ও পুষ্টিকর খাবার প্রাধান্য দিন।

পরিবার ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করুন
পরিবার, বন্ধু ও প্রতিবেশীকে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত করুন। একসঙ্গে সচেতন ইফতার আয়োজন করলে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

মাহে রমজান আমাদের ধৈর্য, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দেয়। এই শিক্ষা শুধু ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রতিফলন ঘটানো উচিত। ইফতারের টেবিল যত বৈচিত্র্যময়ই হোক না কেন, খাবার নির্বাচনে স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং পরিমিতির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেতে হবে।

অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার থেকে দুরে থাকা, অল্প তেলে রান্না করা, ফলমূল ও দই অন্তর্ভুক্ত করা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং পরিমিতভাবে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা- এসব সচেতনতা আমাদের সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। মনে রাখতে হবে, সুস্বাদু খাবারের আকর্ষণ সাময়িক হলেও সুস্থতা দীর্ঘমেয়াদে জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। 

তাই মাহে রমজানে ইবাদতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সবার দায়িত্ব। সচেতনতা ও সংযমের মাধ্যমে আমরা এই পবিত্র মাসকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারি এবং একই সঙ্গে সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যেতে পারি।

লেখক ও গবেষক

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: