রুখতে দরকার আইন

মো. নূর হামজা পিয়াস

মতামত

ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে ‘লাইক ও শেয়ার’র নেশা এক শ্রেণির মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিয়েছে। সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে তারা সামাজিক

2026-03-14T02:46:49+00:00
2026-03-14T02:46:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড
রুখতে দরকার আইন
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ২:৪৬ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে ‘লাইক ও শেয়ার’র নেশা এক শ্রেণির মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নিয়েছে। সস্তা জনপ্রিয়তার মোহে তারা সামাজিক শিষ্টাচার ও মানবিক মূল্যবোধকে বিসর্জন দিচ্ছে। আধুনিক স্মার্টফোন এখন অনেকের হাতেই নিপীড়নের অস্ত্র হয়ে উঠেছে। রাস্তার সাধারণ পথচারীকে তুচ্ছ কারণে মারধর করা কিংবা অশালীন অঙ্গভঙ্গি করাকে তারা এখন ‘স্মার্টনেস’ মনে করছে। যখন অপরাধকে বীরত্ব হিসেবে ক্যামেরাবন্দি করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত বিচ্যুতি থাকে না, বরং এটি আইনি ব্যবস্থার প্রতি এক চরম চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যুগে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ নামে এক নতুন পেশাগত ও সামাজিক শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর আছেন যারা তাদের ভালো কাজের মাধ্যমে সমাজসচেতন বার্তা প্রচার, শিক্ষামূলক তথ্য উপস্থাপন এবং সৃজনশীল বিনোদনের মাধ্যমে জনজীবনে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তবে এই অবারিত স্বাধীনতার সুযোগে একদল বিকারগ্রস্ত ক্রিয়েটরও তৈরি হচ্ছে, যারা জনপ্রিয়তার নেশায় অন্ধ। সৃজনশীলতার আড়ালে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইদানীং এমন সব কর্মকাণ্ড করে বসছেন, যা সমাজে অস্বস্তি, বিরক্তি এবং কখনো কখনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। ভাইরাল হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় তারা সামাজিক শিষ্টাচার ও নৈতিকতার সীমানা লঙ্ঘন করছেন। জনাকীর্ণ স্থানে উদ্ভট আচরণ, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করা কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য উসকানিমূলক কাজ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অপসংস্কৃতি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে অস্থির করে তুলছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ের ব্যস্ত সড়কে এক পথচারীকে রাশিয়ান বংশোদ্ভূত মডেল মনিকা কবির নির্দয়ভাবে পেটাচ্ছেন। এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ মারধর নয়, বরং এটি আইন অমান্য করার চরম ঔদ্ধত্য। ব্যস্ত রাস্তায় একজন নাগরিকের গায়ে হাত তোলা এবং সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা প্রমাণ করে যে, কিছু মানুষ নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করেছে। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, মারধরের সেই ভিডিওটি মনিকা কবির নিজেই নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে আপলোড করেছেন। নিজের অপরাধকে বীরত্ব হিসেবে প্রচার করার এই মানসিকতা সমাজবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে। ভাইরাল হওয়ার মাধ্যমে সস্তা তালি পাওয়ার আশায় তারা আইনি পরিণতিকেও তোয়াক্কা করছেন না। আধুনিক সমাজে যখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায় এবং অপরাধকে ‘কনটেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ এক গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে।

মনিকা কবিরের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কেবল ওই মারধরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি জনসম্মুখে রাস্তায় পোশাক পরিবর্তন করছেন এবং মেট্রোরেলের সাধারণ যাত্রীদের হয়রানি করছেন। কখনো ট্রেনের সিটে অশালীন পোশাকে শুয়ে ভিডিও ধারণ করছেন, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য চরম বিব্রতকর। আধুনিকতার নামে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং গণপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন দৃষ্টিকটু আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কেবল ব্যক্তিগত অভিরুচি নয়, বরং জনস্বার্থ ও শিষ্টাচারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ধারা ২৯৪ অনুসারে জনসম্মুখে অশালীন কাজ বা অঙ্গভঙ্গি করা অপরাধ। এ ছাড়া পথচারীকে মারধর করার বিষয়টি ধারা ৩২৩ (স্বেচ্ছায় আঘাত করা) এবং ধারা ৩৫২ (মারাত্মক উসকানি ছাড়া আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ)-এর অধীনে পড়ে। আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিই নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের উদ্দেশ্যে অপরাধ করা শাস্তির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এর আগেও অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে এমন বিতর্কিত ও হীন কাজ করতে দেখা গেছে। সস্তা ভিউ পাওয়ার জন্য অনেকে ভুয়া খবর ছড়ানো, প্রাঙ্ক ভিডিওর নামে সাধারণ মানুষকে লাঞ্ছিত করা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কাজ করেছেন। পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট অনেককে গ্রেফতার করলেও এই প্রবণতা কমছে না। বরং দিন দিন আরও ভয়ংকর সব উপায়ে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুস্থ পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিক সমান এবং সবাই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। একজন মডেল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবশালী হওয়ার কারণে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে চলে যান না। সাধারণ পথচারীকে পিটিয়ে কিংবা জনশৃঙ্খলার হানি ঘটিয়ে কেউ ছাড় পেতে পারেন না। আইনের শাসন সুসংহত করতে হলে এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এতে করে অন্যদের মধ্যে বার্তা যাবে যে, ডিজিটাল জগৎ মগের মুল্লুক নয়।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে, নেতিবাচক বা বির্তকিত বিষয়গুলো দ্রুত ভাইরাল হয়। এই কারিগরি সুযোগটিকেই কাজে লাগায় বিকারগ্রস্ত কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। তারা জানে যে ভালো কনটেন্টের চেয়ে খারাপ বা অশালীন কনটেন্টে ভিউ বেশি আসে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে তারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতা বিসর্জন দিচ্ছে। প্ল্যাটফর্মগুলোর উচিত এই ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে মুছে ফেলা এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা।

এ ধরনের বিকারগ্রস্ত আচরণের পেছনে পারিবারিক শিক্ষার অভাবকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী দায়ী করছেন। শৈশব থেকেই সামাজিক মূল্যবোধ, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নৈতিকতা শিক্ষা না পেলে একজন মানুষ ভবিষ্যতে কেবল সস্তা খ্যাতির পেছনে ছুটবে। কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের অধিকাংশ তরুণ প্রজন্ম, যারা জীবনকে কেবল ভার্চুয়াল ভিউ এবং লাইকের মাপকাঠিতে বিচার করে। পরিবারের উচিত তাদের সন্তানদের ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রতি নজর রাখা এবং তাদের সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া।

সতত ভাইরাল হওয়ার আকাক্সক্ষা এক ধরনের মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যখন একজন মানুষ অন্যের মনোযোগ পাওয়ার জন্য অপরাধ বা অশালীন কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না, তখন বুঝতে হবে তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। ডিজিটাল আসক্তি তাকে বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং সে কেবল স্ক্রিনের রিঅ্যাকশনের ওপর নিজের সুখ খুঁজে পায়। মনিকা কবিরের মতো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও হয়তো একই ধরনের মানসিক অস্থিরতা কাজ করছে, যার প্রতিকার প্রয়োজন।

রাস্তায় বা গণপরিবহনে কেউ যখন কোনো ক্রিয়েটরের ভিডিওর লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন তার ব্যক্তিগত নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। অনুমতি ছাড়া কারও ভিডিও ধারণ করা কিংবা কাউকে ক্যামেরার সামনে হেনস্থা করা এক ধরনের ডিজিটাল সহিংসতা। সাধারণ মানুষ এখন রাস্তায় বের হতে বা মেট্রোরেলে চলতে ভয় পায় পাছে কোনো ‘টিকটকার’ তাদের ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। নাগরিকদের এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং জনসম্মুখে ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। নিয়ম রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যমান সাইবার নিরাপত্তা আইনের সঠিক ও কঠোর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। কেবল গ্রেফতার করলেই হবে না, বরং আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল অপরাধীদের দ্রুত বিচার হলে অন্যদের মধ্যে ভীতি কাজ করবে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারকে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে এই ধরনের ক্ষতিকর প্রোফাইলগুলো বন্ধের পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা বেরিয়ে গেলে সমাজের অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়বে।

এই কতিপয় অপরাধীর কারণে সৎ ও সৃজনশীল কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন। যারা সত্যি সমাজকে কিছু দিতে চান, তাদের কাজের মূল্যায়ন কমে যাচ্ছে। মানুষ সব ক্রিয়েটরকেই একই পাল্লায় মাপছে, যা অনভিপ্রেত। এই খাতের সুস্থ বিকাশের জন্য ক্রিয়েটরদের নিজেদের মধ্যে একটি সংগঠন বা কোড অফ কন্ডাক্ট থাকা জরুরি। যাতে করে তারা নিজেরাই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন এবং এই পেশার মানমর্যাদা রক্ষা করতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে মিডিয়া ট্রায়াল বেশি হয়। এটি যেমন অপরাধীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, তেমনি অনেক সময় তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল ভাইরাল হওয়ার পর ব্যবস্থা নিলে চলবে না, বরং নিয়মিত তদারকি করতে হবে। মনিকা কবিরের ঘটনায় পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সামাজিক পরিচিতি অপরাধ ঢাকা দেওয়ার হাতিয়ার হতে পারে না।

ডিজিটাল জগৎ আমাদের আশীর্বাদ হলেও এর অপব্যবহার সমাজকে এক অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ ধরনের ব্যক্তিদের ঔদ্ধত্য আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আইন ও নৈতিকতা কতটা হুমকির মুখে। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তিকে আমরা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করব, কিন্তু অপরাধের হাতিয়ার হতে দেব না।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: