লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় একসঙ্গে চার মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন এক বাবা। নিহত চার কন্যা—জয়নব, জাহরা, মালেকা ও ইয়াসমিন ছিল তার সন্তান। শোকাহত বাবা মাহামুদ তকি আর্তনাদ করে বলেন, এই চার মেয়েই ছিল তার জীবনের সবকিছু। একই যুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন নিজের মা-বাবা, শ্যালক ও ভাগ্নেকেও। হামলায় তিনিও আহত হয়েছেন, তার মুখ ও মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) তাদের সবাইকে একসঙ্গে দাফন করা হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যমকে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ইসরায়েল প্রতিদিন দাবি করে তারা নাকি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে তার ছোট ছোট মেয়েরা কি সেই অবকাঠামোর অংশ ছিল?
লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলেও এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। শুক্রবার এক মা ইসরায়েলি বোমা হামলায় নিহত তার পাঁচ ছেলেকে কবর দিয়েছেন। সপ্তাহের শুরুতে বৈরুতের ঘোবেইরি এলাকায় বিমান হামলায় হামদান পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। এতে বাবা আহমেদ হামদান, তার তিন মেয়ে এবং দুই নাতি-নাতনি নিহত হন। হামলার পর কয়েক দিন ধরে তার স্ত্রী ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান, চলমান হামলায় হাজার হাজার পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের সবাই নিহত হয়েছে, আবার কোথাও পুরো পরিবার থেকে মাত্র একজন সদস্য বেঁচে আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া হামলায় লেবাননে অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ম্যারোনাইট খ্রিস্টান গ্রাম আইতোতেও এমন একটি হামলায় একই পরিবারের চার প্রজন্মের ২২ জন সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চার মাস বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ৯৫ বছর বয়সী বৃদ্ধও ছিলেন।
ক্রমাগত হামলা ও সরে যাওয়ার নির্দেশে আট লাখের বেশি লেবানিজ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, লেবাননের পরিস্থিতি অনেকটাই গাজার মতো হয়ে উঠছে—ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বোমাবর্ষণ, বারবার বাস্তুচ্যুতি এবং মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েলি হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। এর আগের বছরগুলোতেও হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে ইরানেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত অসংখ্য পরিবারকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া পরিবারগুলোর গল্প এখন লেবাননের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক হৃদয়বিদারক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এক কিশোরী জানান, বোমা হামলায় তিনি নিজের বাবা-মা ও স্বজনদের হারিয়েছেন এবং বাবাকে নিজের চোখের সামনে টুকরো টুকরো হতে দেখেছেন যে দৃশ্য দেখার চেয়ে মৃত্যু তার কাছে সহজ মনে হয়েছে।
/ইউএমএইচ