উত্তরের প্রমত্তা তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর যমুনা বিধৌত জনপদ গাইবান্ধা। এক সময় এই জনপদের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ছিল কেবলই অনাবাদি বালুরাশি, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের এক বিষাদময় উপাখ্যান। বর্ষায় দুকূল ছাপানো বন্যা আর শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালুচরে মাইলের পর মাইল হেঁটেও সবুজের দেখা মেলা ছিল ভার। তবে গত কয়েক বছরে সেই দৃশ্যপটে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা সেই অভিশপ্ত বালুচরেই এখন সবুজ তরমুজের হাসি। গাইবান্ধার চরাঞ্চলে তরমুজ চাষ কেবল কৃষি সম্প্রসারণ নয়, বরং এক নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
গাইবান্ধার জেলা সদরসহ সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে ১৬৫টি ছোট-বড় চর ও দ্বীপচর। অতীতে এসব এলাকায় কেবল কাউন বা যৎসামান্য বাদামের চাষ হতো। কিন্তু আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিত্র এখন ভিন্ন। চলতি মৌসুমে জেলার চরাঞ্চলে তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় এবার আবাদের হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় প্রায় ৩৫ হেক্টরের বেশি জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ হেক্টর বেশি।
সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা। গত বছর যেখানে মাত্র ৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল, এবার সেখানে দ্বিগুণ বেড়ে ১৮ হেক্টর জমিতে তরমুজের সমারোহ। এছাড়া ফুলছড়িতে ১০ হেক্টর এবং সদর ও গোবিন্দগঞ্জে ৩ হেক্টর করে জমিতে এই রসালো ফলের চাষ হয়েছে। সাদুল্লাপুর ও সাঘাটায় স্বল্প পরিসরে চাষ হলেও কেবল পলাশবাড়ী উপজেলায় এবার কোনো আবাদ হয়নি।
বালুময় মরুপ্রায় চরে তরমুজ ফলানো এক সময় অসম্ভব মনে হলেও বর্তমানে আধুনিক ‘মালচিং’ পদ্ধতি একে বাস্তবে রূপ দিয়েছে। এ সম্পর্কে কৃষকরা জানান, আশ্বিন মাস থেকেই জমি তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়। রোদে তপ্ত বালি থেকে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পলিথিন বা শুকনো পাতা দিয়ে মাটি ঢেকে দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন মাটির পানি উবে যায় না, তেমনি আগাছাও জন্মাতে পারে না।
এর পাশাপাশি 'ড্রিপ ইরিগেশন' বা সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত সাশ্রয়ী উপায়ে গাছের গোড়ায় পানি পৌঁছানো হচ্ছে। চরাঞ্চলের মতো প্রতিকূল পরিবেশে যেখানে পানির অভাব প্রকট, সেখানে এই প্রযুক্তি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে চৈত্র মাসের রোদেলা দুপুরে কৃষকরা এখন খেত থেকে তরমুজ তুলে বাজারে পাঠাচ্ছেন।
এক সময় যারা কাজের সন্ধানে ঢাকা বা অন্য শহরে পাড়ি জমাতেন, সেই কৃষকরাই এখন নিজের চরে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। সুন্দরগঞ্জের ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া শোনালেন তার সফলতার গল্প। তিনি বলেন, ‘আগে এই চরে কিছুই অইতো না, শুধু বালি আর বালি। এবার তরমুজ লাগিয়েছি। সব খরচ বাদ দিয়া বিঘা প্রতি ১৮ থিকা ২০ হাজার টাকা লাভ থাকবো আশা করতাছি।’
একই এলাকার প্রবীণ কৃষক আলী আজগর মন্ডল বলেন, বালির চরে যে এত্ত সুন্দর তরমুজ অইবো, তা কোনোদিন কল্পনাও করি নাই। অহন দূর-দূরান্ত থিকা পাইকাররা চরে আইসা তরমুজ নিয়া যাইতাছে। আমাগো দিন বদলাইয়া গেছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, তারা কৃষকদের মাঠপর্যায়ে গিয়ে আধুনিক পদ্ধতির হাতে-কলমে শিক্ষা দিচ্ছেন। চরের মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী করতে কোন সার কতটুকু লাগবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, গাইবান্ধার চরগুলো এখন সোনালি ফসলের খনি। আমাদের ভুট্টা ও মরিচ ইতোমধ্যে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্র্যান্ডিং পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। তরমুজের যে বাম্পার ফলন ও গুণমান আমরা দেখছি, তাতে খুব দ্রুতই এটি জেলার অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হবে। আমরা কৃষকদের বীজ, সার এবং নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।
সময়ের আলো/জোই