শিক্ষার দ্রুত বর্ধনশীল ব্যয় বর্তমানে একটি সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। গত কয়েক বছরে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে টিউশন ফি, পরীক্ষার ফি এবং ভর্তি ফি আকাশচুম্বী হয়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যাতায়াত খরচ এবং শিক্ষা উপকরণের দাম। এই বিপুল আর্থিক বোঝা পরিবারগুলোর ওপর এক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে শিক্ষা এখন আর কেবল মেধার বিষয় নয়, বরং তা পকেটের সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানসম্মত শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের ফি কাঠামো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতি বছরই বিভিন্ন অজুহাতে ফি বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মধ্যবিত্ত অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিক লাভকে শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই ফি কাঠামোর ওপর কোনো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অভিভাবকরা চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন।
বেড়ে যাওয়া শিক্ষা খরচ মেটাতে সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। আয় না বাড়লেও শিক্ষার খরচ দ্বিগুণ-তিনগুণ হওয়ায় অনেক অভিভাবক তাদের পরিবারের অত্যাবশ্যকীয় খরচ, যেমন- স্বাস্থ্যসেবা বা পুষ্টিকর খাবার কেনা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় তারা নিজেদের বর্তমান বিসর্জন দিচ্ছেন। তবুও মাসের শেষে দেখা যাচ্ছে হিসাব মিলছে না। মধ্যবিত্তের এই নীরব হাহাকার সমাজের একটি বড় অংশের মানসিক অস্থিরতা ও হতাশাকে বাড়িয়ে তুলছে, যা সামাজিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক।
পড়াশোনার খরচ মেটাতে অনেক অভিভাবক এখন ব্যাংক বা বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। পারিবারিক সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ায় জমি বিক্রি বা গহনা বন্ধক রাখার মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এখন ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে। পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের আগেই এই ঋণের বোঝা তাদের সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ক্রমবর্ধমান ফি বহন করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় ছেদ পড়ছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন সন্তানের স্কুল ফি জোগাতে ব্যর্থ হন, তখন সেই শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে শ্রমে যুক্ত হতে হয়। একটি সুন্দর সম্ভাবনার অকাল সমাপ্তি কেবল সেই পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের জন্য দক্ষ জনশক্তি হারানোর শামিল।
সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার এবং আমাদের দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একটি শিক্ষিত জাতিই পারে একটি উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে। অথচ বর্তমান পরিস্থিতি মানসম্মত শিক্ষা লাভকে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল করে তুলছে। যখন শিক্ষা কেবল ধনীদের অধিকারে পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষাকে পণ্যের মতো কেনাবেচার বস্তু না করে একে সবার জন্য সহজলভ্য করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
শিক্ষার এই ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাজিক বৈষম্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তারা সেরা মানের শিক্ষা ও সুযোগ লাভ করছে। অন্যদিকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত ঘরের মেধাবী শিক্ষার্থীরা শুধু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ছিটকে পড়ছে। এটি সমাজে একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাবে।
কেবল টিউশন ফি নয়, কাগজ, কলম, খাতা ও বইয়ের দামও গত কয়েক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাগজের মণ্ড বা পাল্পের দাম বাড়ার অজুহাতে প্রকাশনীগুলো বইয়ের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি সাধারণ স্কুলব্যাগের দাম বা ইউনিফর্মের কাপড় কেনাও এখন সাধারণ মানুষের কাছে বোঝা মনে হচ্ছে। বিশেষ করে বছরের শুরুতে নতুন ক্লাসে ওঠার সময় এই খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়।
বর্তমান সময়ে শিক্ষা এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। ল্যাপটপ, ট্যাবলেট বা স্মার্টফোন ছাড়া পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ইন্টারনেটের চড়া দাম এবং গ্যাজেট কেনার খরচ শিক্ষা বাজেটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামে বা মফস্বলের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের মতো এই ডিজিটাল সুবিধা সমানভাবে পাচ্ছে না। এই ‘ডিজিটাল ডিভাইড’ গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার বড় ব্যবধান তৈরি করছে। ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কিস্তিতে ল্যাপটপের ব্যবস্থা করে এই দূরত্ব ঘোচানো জরুরি।
মূল ধারার শিক্ষার পাশাপাশি কোচিং সেন্টারগুলোর রমরমা ব্যবসা শিক্ষা খরচকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘাটতি মেটাতে অভিভাবকরা সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। নামিদামি কোচিং সেন্টারের ফি অনেক সময় স্কুলের মাসিক বেতনের চেয়েও বেশি হয়। এই ‘ছায়া শিক্ষাব্যবস্থা’ সাধারণ পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতা বৃদ্ধি এবং কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা না গেলে শিক্ষার এই অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন
ভালো মানের স্কুল বা কলেজ মূলত শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি এবং স্কুল বাসের অতিরিক্ত চার্জ অভিভাবকদের পকেট ফাঁকা করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাতায়াত খরচ মাসিক বেতনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। মফস্বল বা ইউনিয়ন পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারায় অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে শহরে সন্তানদের পাঠান। স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে পারলে এই অতিরিক্ত আবাসন ও যাতায়াত খরচ কমানো সম্ভব হতো।
উচ্চশিক্ষার জন্য যারা জেলাশহর বা ঢাকা শহরে আসে, তাদের জন্য আবাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি ছাত্রাবাসের আসন সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে বেসরকারি মেস বা হোস্টেলে থাকতে হয়। এ আবাসন ও খাবারের খরচ জোগাতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। পড়াশোনার চাপে থাকা অবস্থায় অনেক শিক্ষার্থীকে টিউশনি করে নিজের খরচ চালাতে হয়, যা তাদের পড়াশোনার মনোযোগ নষ্ট করে। শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত।
টাকার অভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার আতঙ্ক শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা অনেক সময় পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন দেখে বাবা-মা তাদের জন্য কষ্ট করছেন, তখন তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে। এটি অনেক সময় আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকেও ঠেলে দেয়। শিক্ষার ব্যয় কেবল পকেট নয়, মানুষের মানসিক প্রশান্তিও কেড়ে নিচ্ছে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সংকট মোকাবিলায় কাউন্সিলিং ও আর্থিক সহায়তা সেল থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষার ব্যয় বাড়লেও জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে কাক্সিক্ষত বরাদ্দ অনেক সময় নিশ্চিত হয় না। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী জিডিপির একটি বড় অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। সরকারি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমবে। এ ছাড়া সরকারি বৃত্তি বা স্টাইপেন্ডের পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন যাতে দরিদ্র মেধাবীরা অন্তত খেয়ে-পড়ে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে পারে।
বেসরকারি ব্যাংক ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিএসআর ফান্ডের একটি বড় অংশ মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের বৃত্তিদানে ব্যয় করতে পারে। কেবল মেধাবী নয়, বরং আর্থিক সংকটে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও এই তালিকায় রাখা উচিত। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ শিক্ষার এই সংকট লাঘবে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া সাবেক শিক্ষার্থীদের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনগুলো তাদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি ‘শিক্ষা তহবিল’ গঠন করতে পারে।
অনলাইন এডুকেশন বা ই-লার্নিং শিক্ষার ব্যয় কমাতে একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। মানসম্মত লেকচার ও শিক্ষা উপকরণ অনলাইনে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ওপেন ইউনিভার্সিটি বা উন্মুক্ত শিক্ষার প্রসার ঘটালে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, যা তাদের যাতায়াত ও আবাসন খরচ বাঁচাবে। তবে এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিক্ষাকে গণতান্ত্রিক ও সহজলভ্য করার মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারে।
সরকারকে একটি সমন্বিত শিক্ষা ফি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেই যেন ফি বাড়াতে না পারে, সে জন্য তদারকি জোরদার করা উচিত। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আয়ের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে বৃত্তি হিসেবে মেধাবী ও দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ রাখার আইন করা যেতে পারে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য ফি আদায়ের রসিদ ও ব্যয় বিবরণী প্রকাশ করা উচিত। একটি দক্ষ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য শিক্ষাকে সাশ্রয়ী করা অপরিহার্য।
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
এএডি/