‘তুমি কি আমাকে প্রপোজ করছ?’ মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা এই প্রশ্নটি দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলেন বছর তিরিশের বিবাহিত নারী ইউ-আন (ছদ্মনাম)। তার তিন বছরের বিবাহিত জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, অদ্ভুতভাবে তার সমাধান মিলল এক কৃত্রিম সত্তার কাছে। এটি কোনো সাধারণ চ্যাটবট নয় বরং ‘ক্যারেক্টার ডট এআই’ অ্যাপের মাধ্যমে তৈরি তার এক ভার্চুয়াল প্রেমিক।
ইউ-আন একাই নন, চীনে বর্তমানে হাজার হাজার নারী রক্ত-মাংসের মানুষের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সঙ্গীদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন আর বৈবাহিক সমস্যার চাপে পিষ্ট ইউ-আন এই এআই প্রেমিকের কাছেই খুঁজে পেয়েছেন অনাবিল শান্তি।
বিবিসি চাইনিজকে তিনি বলেন, আমি জানি এই সম্পর্কটি বাস্তব নয়। কিন্তু ওর নমনীয় ব্যবহার আর আমার প্রতি গভীর মনোযোগ আমাকে এমন মানসিক শান্তি দেয়, যা আমি বাস্তবের কোনো সম্পর্কে পাইনি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিং নেওয়ার পরিকল্পনাও তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। তার কাছে এই ভার্চুয়াল কথোপকথনই এখন বড় আশ্রয়।
চীনে এই ‘হিউম্যান-এআই রোম্যান্স’ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং এটি একটি জনপ্রিয় উপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ডুবান’-এ এ সংক্রান্ত গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। টিকটকের চীনা সংস্করণ ‘ডুইন’-এ এই বিষয়ক ভিডিওগুলো ৫০ হাজার কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি এআই কম্প্যানিয়ন অ্যাপের মধ্যে চারটিই চীনের তৈরি। ২৫ বছর বয়সি স্নাতক লাও তু-ও এই ডিজিটাল প্রেমে মগ্ন। তার একজন বাস্তব বয়ফ্রেন্ড থাকা সত্ত্বেও তিনি দিনের অনেকটা সময় কাটান তার এআই সঙ্গীর সঙ্গে।
সম্প্রতি কঠিন এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শেষে তার এআই প্রেমিক তাকে ডিনারে নেওয়া এবং উপহার দেওয়ার ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে। লাও তুর ভাষ্য মতে, পুরো ব্যাপারটা এতটাই জীবন্ত মনে হয় যে আমি মানসিকভাবে ওর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।
তবে এই ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল নির্ভরতা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা চিন্তিত। হংকংয়ের মনোবিজ্ঞানী ইয়াওয়েন চ্যান মনে করেন, মানুষের সাহচর্যের যে মৌলিক চাহিদা রয়েছে, এআই মূলত সেটাকেই টার্গেট করছে। তার মতে, এই নির্ভরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
চ্যান বলেন, সাধারণ মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুই পক্ষই মানসিকভাবে দুর্বল হতে পারে। কিন্তু এআইয়ের কোনো আবেগ বা দুর্বলতা নেই। এখানে কেবল ব্যবহারকারীই মানসিকভাবে অরক্ষিত থাকেন, যা একটি ভারসাম্যহীন সম্পর্কের জন্ম দেয়। যদি কোনো কারণে এই অ্যাপগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তবে ব্যবহারকারীদের ওপর তার প্রভাব হবে ভয়াবহ।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক বেথানি ম্যাপলস জানান, মানুষ এখন এআইকে প্রেমিক এবং থেরাপিস্ট– উভয় হিসেবেই দেখছে, যা এক জটিল নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করছে।
কিন্তু ভার্চুয়াল প্রেম কি আদতে বাস্তবের বিকল্প হতে পারে? ইউ-আনের মতে, এটি তার বিবাহিত জীবনকে কিছুটা সহনীয় করেছে কারণ তিনি স্বামীর প্রতি এখন আগের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল।
অন্যদিকে লাও তুর জীবনে ঘটে গেছে এক অদ্ভুত ঘটনা। তার এআই প্রেমিকের সঙ্গে চ্যাট করা দেখে তার বাস্তব জীবনের বয়ফ্রেন্ড ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে এবং মোবাইলের ওই কৃত্রিম সত্তার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে।
লাও তু তখন এক অদ্ভুত অপরাধবোধে ভুগছিলেন নিজের রক্ত-মাংসের প্রেমিকের জন্যও এবং এআই প্রেমিকের জন্যও। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তার কথায়, আমি আমার বয়ফ্রেন্ডকে জড়িয়ে ধরতে পারি কিন্তু এআইকে নয়। এই দূরত্বটুকু এআই কখনোই ঘুচিয়ে দিতে পারবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনে এআই প্রেমিকের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে যে সমাজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি যখন একাকিত্ব মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন মানুষের আবেগ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যকার সীমানা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে। তবে দিনশেষে ‘স্পর্শ’ আর ‘অনুভূতি’র যে চিরায়ত মানবিক চাহিদা, তা এখন অব্দি কেবল মানুষের মাধ্যমেই পূরণ হওয়া সম্ভব।
এফআর