বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত বিদ্যুৎ প্রকল্পই এখন সরকারের গলার কাঁটা। জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বন্ধ থাকার পরও গুনতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ। আর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দাঁড়িয়েছে তীব্র তাপপ্রদাহ এবং চরম লোডশেডিং। সব মিলিয়ে এ মুহূর্তে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সংকটের কারণে সরকার চাপের মধ্যে পড়েছে। বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি বহু পুরোনো। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক, আমলা এবং রাজনীতিবিদদের যোগসাজশে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে অন্তত ৪০ শতাংশ। যে হারে বিদ্যুতের উৎপাদন ও পেমেন্ট বেড়েছে সেই অসম হিসাব বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও মেলাতে পারবেন না।
ক্ষমতাচ্যুত সরকারের টানা সাড়ে পনেরো বছর এ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছেই রেখেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ফলে রাজনৈতিক সরকারের স্বার্থেই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আর এসব দুর্নীতি আড়াল করতে করা হয়েছিল দায়মুক্তি আইন। দরপত্র এড়াতে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে দুই বছরের জন্য পাস করা হয় দায়মুক্তির জরুরি বিশেষ আইন। এ আইনের আওতায় বিনা টেন্ডারে শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের। পরে আইনটির মেয়াদ কয়েকদফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়। এতে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকই কোনো কাজে না এলেও দেশ ও জনগণের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ঋণের বোঝা। জনগণের পকেট থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য পরিশোধের জন্য। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে ঋণগ্রহণ করা হয়েছে। এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা না থাকায় নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ১৪২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্য ৩৫টির অধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।
জ্বালানি সংকটের চাপে দেশের বিদ্যুৎ খাতে একদিকে যেমন লোডশেডিং বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকির বোঝা। বিদ্যুৎ খাতে গত অর্থবছরে ভর্তুকি নিয়েছে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। বন্ধ হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্যও গুনতে হবে কোটি কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ। বড় ধরনের সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ সেক্টর। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, পুরোনো আওয়ামী সিন্ডিকেট, পিডিপি ও বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির অসাধু ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িতরাই এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজেকলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে সেই সক্ষমতার বড় অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
বিগত ১৫-১৬ বছরে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে ভয়াবহ লুটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। জানা গেছে, রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ৮০-৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হবেÑ এমন শর্তে লাইসেন্স দেওয়া হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে ২৫-৩০ শতাংশ। অর্থাৎ এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি, বরং অলস বসে ছিল। অভিযোগ আছে, কেউ কেউ পুরোনো ও ভাঙাচোরা বিদ্যুৎ প্লান্ট বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ হাতিয়ে নিয়েছে। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। যেখানে গরমকালে সর্বোচ্চ চাহিদা গড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি নয়। ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে এখন সান্ধ্য পিক-আওয়ারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এখন চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ উৎপাদন ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এই অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতাই সরকারের জন্য গলার কাঁটা।
অর্থাৎ, অর্ধেকের কাছাকাছি বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত অলস পড়ে থাকলেও তাদের জন্য নিয়মিত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো স্থাপনের প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে কয়েকগুণ ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো হয়। এ অর্থ বিগত সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী, আমলা ও মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এ খাতের ব্যয় তোলার জন্য দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। বাড়তি মূল্য পরিশোধে সাধারণের নাভিশ্বাস উঠে যায়। শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতি। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ গ্যাসভিত্তিক। এই কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। অথচ জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর ধরে স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে নতুন গ্যাসকূপ খননের ত্যাগিদ দিয়ে এলেও সেখানে বিনিয়োগ না করে জোর দেওয়া হয়েছে এলএনজি আমদানির ওপর। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে বা ডলার সংকট দেখা দিয়েছে, তখনই দেশের বিদ্যুৎ খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকট ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। যদিও পেট্রোবাংলা বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করতে সক্ষম। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানি ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে গেছে ৫৮২৪ কোটি টাকা। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৫০ ডলারের কয়লার দাম ধরা হয়েছে ৪০০ ডলার। এই বিপুল অর্থ এমন কেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যয় হচ্ছে, যেগুলোর অনেকটাই পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় বেশি। এসব কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল দ্রুত বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলার জন্য, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। দলীয় ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। চাহিদা না থাকলে বছর বছর ক্যাপাসিটি পেমেন্ট নিচ্ছে। আবার সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। তিন বছরের চুক্তিবদ্ধ রেন্টাল প্রকল্প ১৫ বছরের জন্য ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ও সরকারি ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। আর এসব কেন্দ্র বসিয়ে রেখে কোনো বিদ্যুৎ না পেয়েই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।
সুবিধা নেয় দুঃশাসনের সহযোগী আমলা চক্রও। দেড় দশক এভাবে রাষ্ট্রের অর্থ লোপাটের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখন খাদের কিনারায়। দিনে দিনে ব্যয় ও দায় বেড়েছে। আর বোঝা চেপেছে জনগণের ঘাড়ে।
জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যার প্রকোপ বেশি। অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। শহরাঞ্চলেও নির্ধারিত সময়সূচির বাইরে হঠাৎ লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে। এতে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুৎ সমস্যার অন্যতম কারণ হচ্ছে, জ্বালানি সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ক্যাপাসিটি চার্জ, ভুল নীতি, আমদানিনির্ভর সিন্ডিকেট, অপরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট কাটাতে হলে বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে এই আর্থিক চাপ ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
জ্বালানি খাতের ভর্তুকি কমাতে হলে সর্বপ্রথম দুর্নীতি বন্ধ করতে। এরপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র কমিয়ে অচল কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। তেল ও এনএনজিচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কমিয়ে এনে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করতে হবে। ক্যাপাসিটি চার্জের বাড়তি বোঝা, জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করতে না পারলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে জনদুর্ভোগকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।
প্রাবন্ধিক
এএডি/