চলমান সংঘাত থামাতে এবং পারমাণবিক ইস্যুতে নতুন কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে একটি এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। মার্কিন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর এটাই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
বুধবার (৬ মে) মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস আশা করছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান খসড়া চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোতে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেবে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি, তবুও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা দ্রুত এগোচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
কী আছে খসড়া স্মারকে
খসড়া সমঝোতা স্মারকে মোট ১৪টি ধারা রয়েছে বলে জানা গেছে। এর প্রধান বিষয়গুলো হলো— ইরান সাময়িকভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত রাখবে, যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করা হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল বা তুলে নেওয়া হবে।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এসব শর্তের অনেকটাই একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভর করবে। ফলে এই সমঝোতা কার্যকর হলেও তা সাময়িক হতে পারে।
৩০ দিনের আলোচনার রোডম্যাপ
সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে এবং এরপর ৩০ দিনের আলোচনার সময়সীমা শুরু হবে। এই সময়ের মধ্যে— পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিস্তারিত চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ধাপ নির্ধারণ করা হবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হবে।
এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভাতে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
পারমাণবিক ইস্যু
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানে বড় পার্থক্য রয়েছে— যুক্তরাষ্ট্র চায় দীর্ঘমেয়াদি (প্রায় ২০ বছর) স্থগিতাদেশ, কিন্তু ইরান প্রস্তাব করেছে ৫ বছর। তবে বর্তমানে আলোচনায় সম্ভাব্য সমঝোতা ১২–১৫ বছরের মধ্যে।
মার্কিন পক্ষ একটি শর্ত যুক্ত করতে চাইছে— ইরান যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে।
এছাড়া খসড়ায় আরও থাকতে পারে— ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা থেকে বিরত থাকবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা (জাতিসংঘসহ) যে কোনো সময় আকস্মিক পরিদর্শন করতে পারবে বলে সম্মত হবে ইরান।
ইউরেনিয়াম সরানো নিয়েও আলোচনা
দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান তার উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নিতে সম্মত হতে পারে, যা এতদিন তারা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। বিকল্প হিসেবে এই উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
সামরিক উত্তেজনা কমানোর শর্ত
একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ৩০ দিনের আলোচনাকালে— হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে ইরানের বাধা ধীরে ধীরে প্রত্যাহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও নৌ অবরোধ শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা হবে।
তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় অবরোধ আরোপ বা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখবে।
পর্দার আড়ালের কূটনীতি
এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন— ডোনাল্ড ট্রাম্পের-ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি দল, জ্যারেড কুশনার, মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং একাধিক ইরানি কর্মকর্তা।আলোচনা সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে একাধিক স্তরে চলছে।
অনিশ্চয়তা ও সংশয়
মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে বিভাজন রয়েছে, যা চুক্তি চূড়ান্ত করতে বাধা হতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা এখনো সন্দিহান—প্রাথমিক সমঝোতাও আদৌ সম্ভব হবে কি না।
এর আগে, বিভিন্ন সময় উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, এই ধরনের চুক্তি একদিনে করা সম্ভব নয়। এটি অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত। তবে একটি কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতেই হবে।
তবে তিনি ইরানের কিছু নেতার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, তারা আদৌ চুক্তিতে পৌঁছাবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
সম্ভাব্য প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা সফল হলে— মধ্যপ্রাচ্যে তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা কমতে পারে, বৈশ্বিক তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে, পারমাণবিক সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলতে পারে। তবে আলোচনায় ব্যর্থতা ঘটলে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
/ইউএমএইচ