হাওড়ের কান্না থামাতে হবে

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

প্রকৃতি যেখানে অবারিত ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছে, সেই হাওড়াঞ্চল আজ বিষাদের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। কবি জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র সেই স্নিগ্ধ

2026-05-12T13:53:30+00:00
2026-05-12T13:53:30+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
মতামত
হাওড়ের কান্না থামাতে হবে
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ১:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ২৪)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রকৃতি যেখানে অবারিত ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছে, সেই হাওড়াঞ্চল আজ বিষাদের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। কবি জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র সেই স্নিগ্ধ সজল প্রকৃতি যেন আজ তার সন্তানদের চোখের জলে একাকার। ২ মের সকালে আহাদ মিয়া যখন দেখলেন তার তিল তিল করে গড়ে তোলা ফসল পানির নিচে, তখন তার হৃদযন্ত্র আর সেই ভার সইতে পারেনি। এই মৃত্যু কেবল একজনের নয়, এটি সমগ্র কৃষক সমাজের প্রান্তিক অবস্থার এক চরম প্রতিফলন।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিশাল জলমগ্ন জনপদ হলো সিলেট বিভাগ। এখানে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় হাওড়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই বিভাগে প্রায় ১৫৫টি হাওড় ও অসংখ্য বাঁওড় রয়েছে, যার মোট আয়তন বিশাল। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড় বা হাকালুকি হাওড়ের নাম তো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি কেবল মাছের ভান্ডার নয়, বরং বোরো ধানের এক বিশাল চারণভূমি।

সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর থাবা পড়েছে সিলেট বিভাগে। ২০২২ ও ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি মুছতে না মুছতেই ২০২৬ সালের এই আগাম বন্যায় সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। পাকা ধান কাটতে না কাটতেই পাহাড়ি ঢল এসে কেড়ে নিয়েছে সব। চারদিকে আজ শুধু হাহাকার আর ‘হাওড়ের কান্না’।
আরও পড়ুন

ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত কিশোরগঞ্জ জেলাকে বলা হয় ‘হাওড়ের রাজধানী’। এই বিভাগের কিশোরগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের কিছু অংশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে বাঁওড় ও জলাভূমি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বিভাগে হাওড়ের সংখ্যা ৫২টি এবং বাঁওড় রয়েছে অগণিত। এই জলাশয়গুলো বর্ষায় সাগরের মতো রূপ ধারণ করে, আবার শুকনো মৌসুমে হয়ে ওঠে সোনারঙা ধানের ক্ষেত।
ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ যখন সোনালি ধানের ঘ্রাণে চারপাশ ম ম করার কথা, তখন সেখানে পচা ধানের গন্ধ। হঠাৎ আসা অতিবৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমি। কৃষকের গোলায় যেখানে ধান ওঠার কথা, সেখানে আজ পানির ঢেউ খেলা করছে। এই চিত্র পুরো হাওড়বেষ্টিত ঢাকা বিভাগের।

ময়মনসিংহ বিভাগে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী বা কলমাকান্দার মতো এলাকাগুলো পুরোপুরি হাওড়নির্ভর। এ বিভাগে ৩০টির মতো বড় হাওড় রয়েছে। এখানকার ভূ-প্রকৃতি এমন যে, সামান্য বৃষ্টিতেই ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল মুহূর্তের মধ্যে ফসলের মাঠকে গ্রাস করে নেয়। 

ময়মনসিংহ বিভাগে ভারতের মেঘালয় থেকে আসা পাহাড়ি ঢল এখন প্রতি বছরের অভিশাপ। নেত্রকোনার কৃষকরা জানান, তারা যখন দেখেন তাদের চোখের সামনে পরিশ্রমের ফসল ডুবে যাচ্ছে, তখন তাদের আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা থাকে না। প্রতিটি ঢেউ যেন কৃষকের বুকের ওপর একেকটি হাতুড়ির ঘা। চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর ও সরাইল উপজেলা হাওড়াঞ্চলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নাসিরনগরের রামপুর গ্রামের সেই বুকফাটা আর্তনাদ প্রমাণ করে, এ বিভাগে প্রায় ১০টি বড় হাওড় কৃষকদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। মেঘনা ও তিতাস নদীর অববাহিকায় অবস্থিত এই বাঁওড়গুলো একসময় মাছ ও ফসলে উপচে পড়ত, যা আজ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।

রংপুর বিভাগে নদীবিধৌত অনেক এলাকা থাকলেও কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় ছোট ছোট অনেক ‘বিল’ বা বাঁওড়সদৃশ জলাভূমি রয়েছে। এখানকার প্রায় ১৮টি বড় বিল এবং চরাঞ্চল হাওড়ের মতোই আচরণ করে। এই বিস্তীর্ণ বালুচর ও জলমগ্ন এলাকাগুলোতে রবিশস্য এবং ধানের চাষ হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রংপুর বিভাগে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের আগ্রাসনে কৃষকের ফসল বিনাশী দৃশ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক। চরাঞ্চলগুলোতে চাষ করা চীনা বাদাম, ভুট্টা ও ধান হঠাৎ বন্যায় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উত্তরের এই মানুষগুলো সারা বছর কায়িক শ্রম দিয়ে যা ফলায়, তা এক নিমিষেই প্রকৃতির করালগ্রাসে হারিয়ে যায়।

রাজশাহী বিভাগ মূলত বরেন্দ্র অঞ্চলের জন্য পরিচিত হলেও চলনবিলের এক বিশাল অংশ এই বিভাগে পড়েছে। পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলাজুড়ে বিস্তৃত এই চলনবিল বাংলাদেশের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ জলাভূমি। এখানকার বাঁওড় ও বিলগুলোতে মাছ চাষের পাশাপাশি প্রচুর ধান উৎপাদন হয়, যার মোট আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি।

খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ‘বাঁওড়’ বা অশ্বখুরাকৃতি হ্রদের আধিক্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ঝিনাইদহ, যশোর ও কুষ্টিয়া জেলায় বড় বড় ৫৪টি বাঁওড় রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের এই জলাভূমিগুলো লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখে। তবে সাম্প্রতিক জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এই হাসি কেড়ে নিচ্ছে।

বরিশাল ও পটুয়াখালীর কথা না বললেই নয়। এ অঞ্চলের নদীগুলোর মোহনায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য ‘দোন’ বা জলাভূমি হাওড়ের মতো বৈশিষ্ট্য বহন করে। এখানকার প্রায় ৪০টি বড় বিলে কৃষকরা ফসল ফলায়। 

বরিশাল বিভাগে নদীভাঙন আর জলোচ্ছ্বাসের দ্বিমুখী আক্রমণে কৃষকের হাহাকার চরমে। উপকূলীয় এই জনপদে যখনই সোনালি ফসলে মাঠ ভরে ওঠে, তখনই কোনো না কোনো
প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে সব ওলটপালট করে দেয়। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা আর প্রকৃতির সঙ্গে অসম লড়াইয়ে ক্লান্ত আজ আমাদের বাংলার কৃষকরা।

হাওড়ের কান্না চিরতরে বন্ধ করতে হলে প্রথমেই সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ গ্রহণ করতে হবে। নেদারল্যান্ডসের আদলে আমাদের ডেল্টাপ্ল্যান ২১০০-এর যথাযথ বাস্তবায়ন এবং হাওড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। কোনোভাবেই যেন অপরিকল্পিত ডুবো সড়ক বা বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরকে এগিয়ে আসতে হবে স্বল্পমেয়াদি ও জীবনকাল কম এমন জাতের ধান নিয়ে। ধান পাকার সময় যদি ১০-১৫ দিন এগিয়ে আনা যায়, তবে আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া হার্ভেস্টার মেশিনের সরবরাহ বাড়িয়ে দ্রুত ফসল কাটার ব্যবস্থা করতে হবে।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকারকে হাওড়াঞ্চলের রাস্তাঘাট নির্মাণের সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন পানি চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত কালভার্ট ও ব্রিজ থাকে। পানির পথ বন্ধ করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। 

আইসিটি মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। হাওড়াঞ্চলের প্রতিটি কৃষকের ফোনে আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের জন্য অত্যাধুনিক অ্যাপ ও রিয়েল-টাইম ডাটা সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে আবহাওয়ার সঠিক পূর্বাভাস প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে তারা সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারবে।

কৃষকদের সমবায় ভিত্তিতে ‘শস্য বীমা’র আওতায় আনতে হবে। যদি কোনো কৃষক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারান, তবে বীমা কোম্পানি যেন তাৎক্ষণিকভাবে তার ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে। এতে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তৈরি 

হবে এবং আহাদ মিয়ার মতো কাউকে শোকাতুর হয়ে মারা যেতে হতো না। হাওড়াঞ্চলে ড্রেজিং বা নদী খনন কার্যক্রম জোরালো করতে হবে। দীর্ঘদিনের পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে, ফলে পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বছরব্যাপী ড্রেজিং কার্যক্রম চালু রাখতে হবে যাতে বর্ষার পানি দ্রুত সরে যেতে পারে।

হাওড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে। মাছের অভয়াশ্রম রক্ষা এবং প্রাকৃতিকভাবে পানি শোষণের জন্য হিজল-করচ বাগান পুনরায় গড়ে তুলতে হবে। বন বিভাগকে এ বিষয়ে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে যা একদিকে পরিবেশ রক্ষা করবে এবং অন্যদিকে ঢেউয়ের ঝাপটা থেকে বাঁধকে রক্ষা করবে।

সার ও বীজের সহজলভ্যতা এবং আপৎকালে বিনাসুদে কৃষিঋণ প্রদান করতে হবে। ভুক্তভোগী কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সহায়তা প্রদান করতে হবে। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সহায়তা পায়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে। হাওড়কে কেবল শোষণের ক্ষেত্র না ভেবে একে জীবন্তসত্তা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কবি জসীমউদ্‌দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ যেন শ্মশান না হয়ে ওঠে, সে দায়িত্ব আমাদের সবার। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনেই কেবল বন্ধ হতে পারে ‘হাওড়ের কান্না’।

হাওড় আমাদের সম্পদ, আমাদের অস্তিত্ব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘মানুষের ধর্ম’ হলো সৃষ্টির রক্ষা। সেই রক্ষাকর্তা হিসেবে আজ রাষ্ট্র ও সমাজকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। নাসিরনগরের আহাদ মিয়ার বিদেহী আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন আর কোনো কৃষককে পানির নিচে সোনালি স্বপ্ন ডুবে যেতে দেখতে হবে না। আমাদের প্রযুক্তি, নীতি এবং মমত্ববোধ দিয়ে হাওড়কে সুরক্ষিত করাই হোক আজকের শপথ।

প্রাবন্ধিক

এএডি/


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: