ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবে এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অপারেশন লায়ন্স রোর’ চলাকালে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গোপনে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেন। সেখানে তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তবে কয়েক ঘণ্টা পরই সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য নাকচ করে দেয়। তারা জানায়, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্বচ্ছ ও আনুষ্ঠানিক, যা আব্রাহাম চুক্তির আওতায় পরিচালিত হয়। অঘোষিত কোনো সফর বা গোপন সমঝোতার দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেও উল্লেখ করে দেশটি।
এদিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বলেন, ইরানি হামলা মোকাবেলায় সহায়তা করতে ইসরায়েল সংযুক্ত আরব আমিরাতে আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা পাঠিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আব্রাহাম চুক্তির কারণে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
যদিও এই বক্তব্যের সত্যতা সরাসরি নিশ্চিত করেনি নেতানিয়াহুর কার্যালয়, তারা বলেছে এই সফর ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’।
উল্লেখ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২০ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এরপর থেকে দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে।
‘বহিরাগত’ রাষ্ট্র
ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন অনেক আরব ও মুসলিম দেশের কাছে এক ধরনের ‘বহিরাগত’ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। গাজায় চলমান গণহত্যা এবং সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের পর অধিকাংশ আরব দেশ ইসরায়েল থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরবের কথা বলা যায়। কয়েক বছর আগেও দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিবেচনা করছিল। তবে বর্তমানে তারা তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যেই গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগে ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন।
ইরানের পাল্টা হামলার সময় উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাতি কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরান দেশটির দিকে প্রায় ৫৫০টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২ হাজার ২০০-র বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে, তবুও এসব হামলা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিলাসবহুল পর্যটন ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এদিকে ইরানের হামলায় বাস্তব ক্ষয়ক্ষতির কথাও স্বীকার করেছে আমিরাত। আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি জানিয়েছে, ইরানের দুই দফা হামলার পর দেশটির প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনা ‘হাবশান প্রসেসিং ফ্যাসিলিটি’ আগামী বছরের আগে পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। বর্তমানে এটি মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৭ সালে পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবুধাবি প্রকাশ্যে ও গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রাখতে উৎসাহ দিয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান যেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নিতে না পারে, সে চেষ্টাও করেছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের লাভান দ্বীপে হামলা চালায়।
যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে হামলায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং স্থাপনাটির কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাঁচ সপ্তাহের বিমান অভিযানের পর যুদ্ধবিরতির প্রচার চালাচ্ছিলেন।
ইরান এই ঘটনাকে ‘শত্রুতামূলক হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
/ইউএমএইচ