ফিলিস্তিনি নারীদের সুই-সুতায় গাজার স্মৃতি, ভেনিসে প্রদর্শিত হবে ব্যতিক্রমী ট্যাপেস্ট্রি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গাজার ধ্বংসস্তূপে যখন ভাষা হার মানে, তখন ইতিহাস লেখা হচ্ছে সুই-সুতায়। বোমার শব্দ, গণকবর আর বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও কিছু

2026-05-16T11:55:14+00:00
2026-05-16T11:55:14+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ফিলিস্তিনি নারীদের সুই-সুতায় গাজার স্মৃতি, ভেনিসে প্রদর্শিত হবে ব্যতিক্রমী ট্যাপেস্ট্রি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম 
সুই-সুতায় গাজার গণহত্যার দলিল বুনছেন ফিলিস্তিনি নারীরা। ছবি: সংগৃহীত
গাজার ধ্বংসস্তূপে যখন ভাষা হার মানে, তখন ইতিহাস লেখা হচ্ছে সুই-সুতায়। বোমার শব্দ, গণকবর আর বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও কিছু ফিলিস্তিনি নারী নীরবে বুনে চলেছেন এক জাতির স্মৃতি। তাদের হাতে তৈরি প্রতিটি সেলাই যেন একটি নামহীন মৃত্যুর সাক্ষ্য, প্রতিটি নকশা যেন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যাওয়া কোনো গল্পের পুনর্জন্ম।

সুই-সুতার সেসব নকশা ভেনিস বিয়েনালেতে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে ‘গাজা জেনোসাইড ট্যাপেস্ট্রি’ নামে গাজার গণহত্যা নিয়ে তৈরি এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম।  
সুই-সুতায় তৈরি এই বিশাল ট্যাপেস্ট্রিতে উঠে এসেছে যুদ্ধ, মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প।

ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডানের শরণার্থী শিবিরে থাকা ফিলিস্তিনি নারীরা এটি তৈরি করেছেন। 
১০০টি সূচিকর্মের প্যানেলে তারা গাজার ধ্বংসযজ্ঞ নথিভুক্ত করেছেন। প্রতিটি প্যানেলে রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার সেলাই।

এই প্রকল্পের সহ-কিউরেটর একজন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক জেহান আলফারা। 
তিনি বলেন, একজন সাংবাদিক হিসেবে শব্দই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু গাজার চলমান গণহত্যার সামনে ভাষা অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিকের একটি দৃশ্য আজও আমাকে তাড়া করে ফেরে। একটি বুলডোজার ১১১টি অজ্ঞাত মরদেহকে উজ্জ্বল নীল ব্যাগে মুড়ে গণকবরে দাফন করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের জন্য ভেসে ওঠা সেই দৃশ্য পরে হারিয়ে যায় আরও অসংখ্য ভয়াবহ ছবির ভিড়ে।

১১১টি প্রাণ— যাদের সম্পর্কে কেউ কিছু জানত না। না তাদের নাম, না তাদের স্বপ্ন, না তাদের শেষ মুহূর্তের গল্প।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি শিরোনাম ছিল— ‘দক্ষিণ গাজার একটি গণকবরে ১০০টির বেশি মরদেহ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।’ কিন্তু এমন এক ঘটনার ভয়াবহতা কি কোনো শিরোনামে ধরা সম্ভব?

ইসরায়েল গাজার মানুষের ওপর যা চাপিয়ে দিয়েছে, তাকে ভাষায় প্রকাশের প্রতিটি প্রচেষ্টা যেন বাস্তবতাকে সংকুচিত করে ফেলে। চলমান প্রাণঘাতী এ বিপর্যয়কে শব্দে বেঁধে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

এই সীমাবদ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘গাজা জেনোসাইড ট্যাপেস্ট্রি’— একটি ব্যতিক্রমী শিল্পপ্রকল্প। এটি চলতি বছরে ভেনিস বিয়েনালেতে প্রদর্শিত হবে।


এই ট্যাপেস্ট্রিতে অধিকৃত ফিলিস্তিন, লেবানন ও জর্ডানের শরণার্থী শিবিরে থাকা ফিলিস্তিনি নারীরা সুই-সুতার বুননে গাজার ধ্বংসযজ্ঞ নথিভুক্ত করেছেন। প্রায় ৫৫ হাজার সেলাইয়ের মাধ্যমে একেকটি সূচিকর্মের প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। এমন ১০০টি সূচিকর্মের প্যানেলে নারীরা তৈরি করেছেন গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের এক জীবন্ত আর্কাইভ। যা পৃথিবীকে ভুলতে দেবে না কী ঘটেছে, কার সঙ্গে ঘটেছে।

প্রতিটি প্যানেল যেন একেকটি টুকরো স্মৃতি। কোথাও এক সাংবাদিক নিজের সন্তানের মরদেহ জড়িয়ে কাঁদছেন। কোথাও খালি হাঁড়ি হাতে খাবারের লাইনে দাঁড়ানো শিশুদের পিষে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও ধ্বংসস্তূপের মাঝে এক শিশু বিলাপ করছে।

কিছু ছবি সাময়িকভাবে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। যেমন— খালিদ নাবহান তার নাতনিকে ‘আমার প্রাণের প্রাণ’ বলে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরছেন। আবার চিকিৎসক হুসাম আবু সাফিয়া ইসরায়েলি ট্যাংকের দিকে সেনাদের নির্দেশে হেঁটে যাচ্ছেন— এরপর আর কখনো তাকে দেখা যায়নি।

কিন্তু গাজার অধিকাংশ ছবিই কোনো নাম, প্রেক্ষাপট বা বিদায় ছাড়াই হারিয়ে যায়। সেসব বিস্মৃতি সামনে এই ট্যাপেস্ট্রি এক জীবন্ত সাক্ষী।

সুই-সুতায় গড়া এক জাতীয় আর্কাইভ

‘গাজা জেনোসাইড ট্যাপেস্ট্রি’ মূলত পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘প্যালেস্টাইন হিস্ট্রি ট্যাপেস্ট্রি প্রজেক্টের’ নতুন অধ্যায়। গাজায় জন্ম নেওয়া ডিজাইনার ইব্রাহিম মুহতাদির সঙ্গে এ প্রকল্পের সহ-সভাপতি হিসেবে কাজ করছেন এ প্রতিবেদক ও সাংবাদিক জেহান আলফারা।

বিখ্যাত বায়ো ট্যাপেস্ট্রি এবং গ্রেট ট্যাপেস্ট্রি অব স্কটল্যান্ডের আদলে এটি ফিলিস্তিনের ইতিহাস ও জনগণের জীবন নিয়ে তৈরি সবচেয়ে বড় সূচিকর্ম সংগ্রহ।

ব্রিটিশ নার্স জান চালমার্স ষাটের দশকে দুই বছর গাজায় কাজ করেছিলেন। তার উদ্যোগে প্রকল্পটির শুরু ২০১১ সালে অক্সফোর্ডে। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার খোসা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসভিত্তিক ‘কেইস্কামা হিস্ট্রি ট্যাপেস্ট্রি’ প্রকল্পেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের শতাব্দীপ্রাচীন সূচিকর্মশিল্প ‘তাতরিজ’ দেখে জান চালমার্সের মনে হয়েছিল— ফিলিস্তিনেরও নিজস্ব ইতিহাস ট্যাপেস্ট্রি থাকা উচিত।

২০২১ সালে ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়া এই তাতরিজ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি পরিচয়, সংস্কৃতি ও শিকড়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালের নাকবার পর এটি হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক মাধ্যম। আর আজ তা পরিণত হয়েছে সাক্ষ্যে।

২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা শুরু হওয়ার পর প্রকল্পটি নতুন গতি পায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘প্যালেস্টাইন মিউজিয়াম ইউএস’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর এটি বর্তমানে কানেকটিকাটের উডব্রিজে সংরক্ষিত রয়েছে এবং সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে।


যন্ত্রণার সূত্রে বাঁধা নারীরা

শুরুতে গাজার নারীরাই এ প্রকল্পের অন্যতম সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। তাদের সূচিকর্ম ছিল নিখুঁত ও জীবন্ত। কিন্তু যুদ্ধ তীব্র হওয়ার পর অধিকাংশের সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারা বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গাজায় কাঁচামাল প্রবেশ করতে পারেনি, তৈরি কাজও বাইরে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে একসময় গাজার নারীরাই গল্পকার থেকে গল্পের চরিত্র হয়ে ওঠেন।

তবু ট্যাপেস্ট্রিটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘লাম শামেল’ বা পারিবারিক পুনর্মিলন। বিভিন্ন সীমান্ত ও নির্বাসনের মধ্যেও ফিলিস্তিনি নারীদের শ্রম একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছে ফিলিস্তিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার এক বিশাল দৃশ্যমান দলিল।

লেবাননের আইন এল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরের ইমান শেহাবি, বাসমা নাতুর ও অন্য নারীরা জানান, সূচিকর্মই তাদের জীবিকার উৎস। তবে এই প্রকল্প তাদের মর্যাদার একটি অংশ ফিরিয়ে দিয়েছে।

এক চিঠিতে তারা লিখেছেন, এটি এমন এক জায়গা ছিল, যেখানে ঐতিহ্য গৌরব নিয়ে টিকে ছিল, আর আমাদের সুই একসঙ্গে সেলাই করেছে আমাদের আশা-বেদনার গল্প। শুধু সূচিকর্মশিল্পীরাই নন, শিল্পীরাও এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন।

রামাল্লার শাহলা মাহারিক যে প্যানেলটি তৈরি করেছেন, সেটি ছিল লন্ডনভিত্তিক শিল্পী খাদিজা সাঈদের আঁকা হিন্দ রাজাবের একটি চিত্রের ওপর ভিত্তি করে।


গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক চোখ বাঁধা ফিলিস্তিনিদের একটি চিত্র এঁকেছিলেন হাইফাভিত্তিক অধিকারকর্মী জানান আবদু। পরে সেটি লেবাননের আইন এল-হিলওয়ে শরণার্থী শিবিরে সূচিকর্মে রূপ দেন বোথাইনা ইউসুফ।

গাজাভিত্তিক শিল্পী মোহাম্মদ আলহাজের বাস্তুচ্যুতি বিষয়ক একটি চিত্রও লেবাননে কিফাহ কুরদিয়েহ সূচিকর্মে রূপ দেন। পরে দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ১০ লাখ মানুষও বাস্তুচ্যুত হন।


ভেনিস বিয়েনালেতে গাজার সাক্ষ্য

আগামী ৯ মে থেকে ভেনিসের পালাজ্জো মোড়ায় ‘গাজা–নো ওয়ার্ডস–সি দ্য এক্সিবিট’ শিরোনামে প্রদর্শিত হবে এই ট্যাপেস্ট্রি। প্রদর্শনী চলবে নভেম্বর পর্যন্ত।

সাংবাদিক জেহান আলফারা জানান, গত নভেম্বরে যখন জানা যায় যে প্রকল্পটি ভেনিস বিয়েনালের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, তখন অনুভূতিটা ছিল দ্বৈত।


একদিকে গৌরবের— কারণ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক মঞ্চে এই কাজ এবং এর পেছনের নারীরা সামনে আসার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে, এটি এক ভয়াবহ বৈপরীত্যও সামনে আনে। বিশ্ব ক্রমেই গাজায় চলমান ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকার করছে, কিন্তু সেটি থামাতে পারছে না— বা থামাতে চাচ্ছে না।

রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর শিল্প যদি বাস্তব সময়ের সাক্ষ্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে মানবতার জন্য সেটি কী বার্তা বহন করে— তার সোজাসাপ্টা উত্তর হয়তো নেই।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট— ফিলিস্তিনি নারীরা এখনও গল্প বলে চলেছেন। তারা এখনও জবাবদিহি দাবি করছেন। তাদের এই সংগ্রাম যেন প্রতিধ্বনিত করে প্রয়াত শিক্ষক রিফাত আলারির সেই বিখ্যাত কথাগুলো— ‘যদি আমাকে মরতেই হয়, তবে তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে আমার গল্প বলার জন্য।’

/কেআই


  বিষয়:   ফিলিস্তিন  ট্যাপেস্ট্রি  সুই-সুতা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: